জন্মের পর একটি শিশুর রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রথম স্বীকৃতি আসে জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে। অথচ বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো এই মৌলিক পরিচয়ের বাইরে রয়ে গেছে। বিভিন্ন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দেশে অন্তত প্রায় ১৯ লাখ ৭২ হাজার পথ-সংযুক্ত শিশুর জন্ম নিবন্ধন নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান সময়ে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
জন্ম নিবন্ধন না থাকা শুধু একটি কাগজের অভাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, বয়স প্রমাণ, পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতে নাগরিক সেবা পাওয়ার অধিকার। ফলে নিবন্ধনের বাইরে থাকা একটি শিশু ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় সেবা কাঠামোর বাইরেও চলে যায়।
এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট পথ-সংযুক্ত ও ভাসমান শিশুদের ক্ষেত্রে। তাদের বড় একটি অংশ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, ফুটপাত, বস্তি বা অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস করে। অনেকের বাবা-মায়ের পরিচয় জানা নেই, কারও জন্মস্থান বা জন্মতারিখের নির্ভরযোগ্য নথিও নেই। ফলে সাধারণ প্রক্রিয়ায় জন্ম নিবন্ধন করানো তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউনিসেফের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেশে ‘স্ট্রিট সিচুয়েশনে’ থাকা শিশুর সংখ্যা ৩৪ লাখের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে কারিতাস বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, এ ধরনের শিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন নেই।
এই দুটি জরিপ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তবে দুটি তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক ধারণা পাওয়া যায়। ৩৪ লাখের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ হিসাব করলে প্রায় ১৯ লাখ ৭২ হাজার শিশুর জন্ম নিবন্ধন না থাকার একটি আনুমানিক চিত্র পাওয়া যায়।
এই সংখ্যা শুধু প্রশাসনিক ঘাটতির কথা বলে না, বরং একটি গভীর সামাজিক ঝুঁকিরও ইঙ্গিত দেয়। পরিচয়হীন ও রাষ্ট্রীয় সেবার বাইরে থাকা শিশুদের অপরাধী গোষ্ঠী, মাদকচক্র, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং দখলবাজিতে ব্যবহারের আশঙ্কা বেশি থাকে।
সম্প্রতি পুলিশের প্রতিবেদনে রাজধানীর কিশোর গ্যাংয়ের বড় একটি অংশকে ভাসমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব শিশুর অনেকেই ফুটপাত ও বস্তিতে বসবাস করে। পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তারা সহজেই অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে চলে যেতে পারে।
ইউনিসেফের ২০২৪ সালের গবেষণাতেও একই ধরনের ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলো পথ-সংযুক্ত শিশুদের মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি, দখল এবং অন্যান্য বেআইনি কাজে ব্যবহার করছে।
অর্থাৎ জন্ম নিবন্ধনের অভাব সরাসরি অপরাধে জড়ানোর কারণ না হলেও এটি শিশুর সামাজিক বঞ্চনা বাড়িয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সে সহজেই শোষণের শিকার হতে পারে।
পরিচয়ের অভাবের সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষাবঞ্চনা। কারিতাস বাংলাদেশের জরিপে দেখা গেছে, ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু স্কুল বা মাদ্রাসায় পড়ে না। অর্থাৎ পথ-সংযুক্ত শিশুদের অর্ধেকের বেশি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এর অর্থ ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু এসব কর্মসূচির বাইরে।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো পারিবারিক পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের অনুপস্থিতি। জন্ম নিবন্ধন না থাকা শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর জানে না।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় যে নথি বা পরিচয় প্রয়োজন হয়, তার অনেক কিছুই এসব শিশুর কাছে নেই। ফলে সাধারণ নাগরিকের জন্য যে প্রক্রিয়া জটিল, পথশিশুর জন্য তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রায় অতিক্রম করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সঠিক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শুধু ব্যক্তির নাগরিক অধিকার সুরক্ষার বিষয় নয়। এটি উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, বাজেট বণ্টন এবং সুশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা দেখাচ্ছে, শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; নিবন্ধনের প্রক্রিয়াকে বাস্তবে সহজ, দ্রুত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করাও জরুরি।
কারিতাস বাংলাদেশের জরিপে পথশিশুদের জন্য সহজ নিবন্ধন পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওয়ার্ডভিত্তিক ও ভ্রাম্যমাণ নিবন্ধন কার্যক্রম, হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সরাসরি নিবন্ধন এবং দরিদ্র ও পথশিশুদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় পথশিশুদের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক জটিলতা। অনেক শিশুর বাবা-মায়ের পরিচয় জানা নেই, ঠিকানা নেই, জন্মের কোনো দলিল নেই। ফলে প্রচলিত নথিভিত্তিক পদ্ধতি তাদের জন্য কার্যকর হয় না।
আইনে পরিচয়হীন বা পরিত্যক্ত শিশুর জন্ম নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সাধারণ স্থানে পাওয়া পরিচয়হীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করার বিধানও রয়েছে।
২০২২ সালের ২৭ জুলাই জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। অনলাইনে শিশুর জন্ম নিবন্ধনের আবেদনে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক রাখার শর্ত শিথিল করা হয়।
এ পরিবর্তনের ফলে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন না থাকার কারণে শিশুর নিবন্ধন আটকে যাওয়ার একটি বড় বাধা দূর হয়। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ে জটিলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
গত জুনে আয়োজিত একটি কর্মশালায় সিটি করপোরেশন এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর।
কারিতাস বাংলাদেশের হয়ে পুরান ঢাকায় পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমে যুক্ত প্রোগ্রাম কর্মকর্তা আন্তনী প্রিন্স গমেজ জানিয়েছেন, গত ১৮ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পুরান ঢাকা এলাকায় মাত্র আট শিশুর জন্ম নিবন্ধন এন্ট্রি করানো সম্ভব হয়েছে।
এই সময়ে কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধন সনদ হাতে পাওয়া যায়নি। অথচ শতাধিক শিশুর নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
তাঁর মতে, অনেক কর্মকর্তা পথশিশুদের নিবন্ধন নিতে অনাগ্রহ দেখান এবং আইনি জটিলতার কথা বলেন। এই গতিতে কাজ চললে বছরে ১০০ শিশুর নিবন্ধনও সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় একই সংস্থার উদ্যোগে অন্তত ৪০ শিশুর জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই পার্থক্য দেখায়, আইন একই হলেও বাস্তবায়ন স্থানভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোনো এলাকায় কর্মকর্তা সহযোগিতামূলক হলে কাজ এগোয়, আর অন্য এলাকায় প্রশাসনিক অনীহা থাকলে একই প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়।
জন্ম নিবন্ধন একটি শিশুর আইনগত পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বয়স ও পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, বিচারিক কার্যক্রম এবং নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
জন্ম নিবন্ধন না থাকলে শিশুর টিকা গ্রহণ থেকে শুরু করে স্কুলে ভর্তি, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, চাকরি, বিদেশযাত্রা এবং বিয়ের মতো জীবনঘনিষ্ঠ নানা বিষয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বেসরকারি কিছু সংস্থা পথশিশুদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। কয়েকজনকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোর সময় জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরিতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।
এমনকি পথশিশু বড় হয়ে আইন অনুযায়ী বিয়ে করতে গেলেও জন্ম নিবন্ধন না থাকার কারণে প্রশাসনিক সমস্যায় পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জন্মের পরপরই প্রতিটি শিশুর নিবন্ধন করতে হবে এবং তার নাম ও জাতীয়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে এই সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। ফলে প্রতিটি শিশুর জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদি আহসানের মতে, জন্মের পর নিবন্ধন পাওয়া প্রত্যেক শিশুর অধিকার।
তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, যেসব শিশুর বাবা-মা ও পরিবার আছে, তারাও জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়ছে। তাই যেসব শিশু পরিবারহীন বা পথে বসবাস করে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন।
পথশিশুদের বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে ভোগান্তি শুধু পথশিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ নাগরিকেরাও জন্ম নিবন্ধন সংশোধন, বাবা-মায়ের তথ্য পরিবর্তন এবং মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন।
২০২৬ সালের শুরুতে নতুন সার্ভারে তথ্য স্থানান্তরের কারণে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সংশোধনের কাজ দেড় মাসের বেশি সময় বন্ধ ছিল। এতে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি এবং বিভিন্ন নাগরিক কাজে সমস্যার সৃষ্টি হয়।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আব্দুল হাকিম জানিয়েছেন, চার মাস আগে ছেলের জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলেও এখনো সনদ হাতে পাননি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনে একাধিক ধাপ রয়েছে। বাবা বা মায়ের নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রথমে তাদের নিজস্ব জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া আবেদনকারীর মোবাইল নম্বর সংযুক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র দেওয়াও বাধ্যতামূলক। অনলাইনে একটি জন্ম নিবন্ধন সর্বোচ্চ চারবার সংশোধনের আবেদন করা যায়।
দেশের সামগ্রিক জন্ম নিবন্ধনের চিত্রও এখনো পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৫৯ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন হয়েছে।
তবে জন্মসনদ হাতে রয়েছে মাত্র ৪৭ শতাংশ শিশুর।
২০১৯ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫৬ শতাংশ এবং ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ কিছু অগ্রগতি হলেও নিবন্ধন এবং সনদ হাতে পাওয়ার মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে।
এই তথ্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সরকারি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং পরিবারের হাতে কার্যকর সনদ পৌঁছানো—এই দুটি বিষয় সবসময় একই গতিতে এগোয় না।
জরিপে জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, খরচ, সচেতনতার অভাব এবং ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা এবং জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থার মধ্যেও এখনো পর্যাপ্ত সমন্বয় গড়ে ওঠেনি। ফলে হাসপাতালে জন্ম নেওয়া অনেক শিশুরও জন্মের সময় নিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে না।
এখানেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি বড় সুযোগ রয়েছে। হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং মাতৃসেবা কেন্দ্রের সঙ্গে জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থা সরাসরি যুক্ত করা গেলে শিশুর জন্মের পরপরই নিবন্ধনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
পথশিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও আলাদা ব্যবস্থা। কারণ তাদের অনেকের কাছেই পরিবারভিত্তিক নথি নেই। এ ধরনের শিশুদের জন্য সাক্ষ্য, স্থানীয় প্রশাসনের যাচাই এবং বিশেষ নিবন্ধন পদ্ধতি কার্যকর করা যেতে পারে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, জন্ম নিবন্ধনের সংকট শুধু একটি দাপ্তরিক দুর্বলতা নয়। এটি নাগরিক অধিকার, শিশু সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
যে শিশু রাষ্ট্রের খাতায় নেই, তাকে শিক্ষা, চিকিৎসা বা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে একদিকে ব্যক্তি অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে সরকারের জনসংখ্যাভিত্তিক পরিকল্পনাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে তাই শুধু প্রচার চালালেই হবে না। মাঠপর্যায়ের জটিলতা দূর করা, কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া, পথশিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা চালু করা এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জন্ম নিবন্ধনকে একটি কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা।
যে শিশুর পরিচয় রাষ্ট্রের নথিতে নেই, তার ভবিষ্যৎও অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই নিবন্ধনের বাইরে থাকা প্রায় ২০ লাখ শিশুকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের আওতায় আনা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি সামাজিক সুরক্ষা, নাগরিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।

