গ্যাস সংকটে প্রায় আট মাস বন্ধ থাকার পর আবার উৎপাদনে ফিরেছে জামালপুরের সরিষাবাড়ীর যমুনা সার কারখানা। মঙ্গলবার ভোররাত ৩টার দিকে ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু হয়। কারখানার উৎপাদন বিভাগের প্রধান ফজলুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দীর্ঘ বন্ধের পর কারখানা সচল হওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারী ও আশপাশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকট ও নানা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত টানা ২৩ মাস উৎপাদন বন্ধ ছিল। এরপর কারখানা চালু হলেও চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি গ্যাস সংকটে ফের বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে কারখানাটি বারবার একই সমস্যায় থমকে গেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর কারখানায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও তখনো উৎপাদনে যাওয়া যায়নি। ফজলুল হক জানান, পর্যাপ্ত চাপ না থাকাই ছিল এর কারণ। কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন ব্যাখ্যা করেন, নিরবচ্ছিন্ন ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য গ্যাসের আদর্শ চাপ প্রয়োজন ৪৬ এমএমসিএফ। তবে ৪২ থেকে ৪৩ এমএমসিএফ চাপ থাকলেও উৎপাদন চালানো সম্ভব। অথচ এত দিন তিতাস কর্তৃপক্ষ ২৭ থেকে ২৮ এমএমসিএফ চাপে গ্যাস দিচ্ছিল। ফলে প্রস্তুতি থাকলেও কারখানা চালু করা যায়নি। এখন উৎপাদন শুরু হওয়ায় ধরে নেওয়া যায়, গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
কারখানা সচল হওয়ার প্রভাব পড়েছে আশপাশের এলাকায়ও। সরিষাবাড়ীতে কারখানার চারপাশে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম তালুকদার বলেন, দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মালেক জানান, হোটেলের আয়ের ওপরই তাঁদের সংসার চলে। কারখানা বন্ধ থাকলে হোটেলে লোকজন আসে না, বেচাকেনাও হয় না। এ কারণে তাঁকে অনেক টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ট্রাকচালক মশিউর মিয়া বলেন, কারখানা চালু থাকলে মাসে ১৭ থেকে ২০টি ভাড়া পান তিনি। বন্ধ থাকায় মিলেছে মাত্র তিন-চারটি। তিনি আশা করছেন, এখন শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। এসব বক্তব্যে স্পষ্ট, একটি কারখানা বন্ধ থাকলে শুধু শ্রমিকেরা নন, আশপাশের ছোট ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
যমুনা সার কারখানা দৈনিক ১ হাজার ৭০০ টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে গ্যাসের কম চাপ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন সার উৎপাদন হচ্ছিল। অর্থাৎ পূর্ণ সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন কমই ছিল। অ্যামোনিয়া ও ইউটিলিটি বিভাগের প্রধান ফজলুল হক জানান, বর্তমানে কারখানার সবকিছু সচল আছে। তিনি আশা করছেন, প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন সার উৎপাদন করা যাবে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৯০০ ডিলারের মাধ্যমে এই কারখানা জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলসহ উত্তরবঙ্গের ২১টি জেলায় সার সরবরাহ করে। ফলে কারখানা চালু হওয়ায় এসব এলাকার কৃষকেরা সারের জোগানে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। বিশেষ করে চলমান মৌসুমে সারের সহজলভ্যতা কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
কারখানার আর্থিক হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। দেলোয়ার হোসেন জানান, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সার উৎপাদিত হয়, যা থেকে মুনাফা আসে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও যন্ত্রপাতি সচল রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ৬ কোটি টাকার গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ বন্ধ থাকা মানে একদিকে আয় ও মুনাফা হারানো, অন্যদিকে বিনা উৎপাদনেই খরচের বোঝা বহন করা।
বিশ্লেষকদের মতে, কারখানা চালু হওয়া ইতিবাচক হলেও আসল চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা। গ্যাসের চাপ আবার কমে গেলে কারখানাটি ফের বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত চাপে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং যান্ত্রিক ত্রুটি দূর করতে পুরোনো যন্ত্রপাতির সংস্কার জরুরি। এটি করা গেলে সার আমদানিনির্ভরতা কমানো, কৃষকের চাহিদা মেটানো এবং স্থানীয় অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব হবে।

