বাংলাদেশ রেলওয়ের পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের চাপ কমাতে বহরে যুক্ত করা হচ্ছে ৩০টি নতুন মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত বহু ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়েছে, নির্ভরযোগ্যতা কমেছে এবং ট্রেন পরিচালনাতেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে বড় অঙ্কের নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে বর্তমানে মোট ২৯২টি লোকোমোটিভ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪টি মিটারগেজ এবং ১২৮টি ব্রডগেজ। একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। কিন্তু বর্তমানে ১১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের সেই আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক কারণ ৬২টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের বয়স ৪০ বছরের বেশি। এত পুরোনো ইঞ্জিন এখনো ট্রেন পরিচালনায় ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং যেকোনো সময় যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকিও বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় ‘রেলওয়ের সক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর আওতায় ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের পর ব্যয় কমানো হয়েছে। স্পেয়ার পার্টস, প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ, পরামর্শকসহ বিভিন্ন খাতে প্রস্তাবিত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করা হয়।
সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় এখন ২ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
এই অর্থের মধ্যে ১ হাজার ৯৫৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এই ঋণ দেবে। বাকি ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বহন করবে সরকার।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব পৌরসভা, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন, জামালপুর, নেত্রকোনা পৌরসভা, সিলেট সিটি করপোরেশন, কক্সবাজার পৌরসভা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ফেনী পৌরসভা, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, নোয়াখালী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা এলাকায় এই প্রকল্পের সুফল পড়বে।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো পুরোনো ও জরাজীর্ণ লোকোমোটিভ প্রতিস্থাপন করা এবং মিটারগেজ রেলপথে ট্রেন পরিচালনার নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো।
শুধু নতুন ইঞ্জিন কেনাই নয়, লোকোমোটিভ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রাংশ, ব্যবহারযোগ্য স্পেয়ার পার্টস, সরঞ্জাম এবং কারিগরি সুবিধাও প্রকল্পের আওতায় সংগ্রহ করা হবে।
রেলওয়ের প্রকৌশলী ও সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ রেলওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন কর্মীদের স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দেবেন।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারদের মাধ্যমে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।
এতে নতুন লোকোমোটিভ কেনার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান হস্তান্তরের সুযোগও তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদে রেলওয়ের নিজস্ব জনবল নতুন ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ হয়ে উঠতে পারবে।
প্রকল্পটি ১ এপ্রিল ২০২৬ সালে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এর আগে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিয়েশন কোম্পানি, বাংলাদেশ।
পরবর্তীতে ১৪ মে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা হয়। সেখানে কিছু ব্যয়কে অযৌক্তিক বা বেশি মনে হওয়ায় সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর ফলেই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫৮ কোটি টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা আছে।
কিন্তু ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। ফলে ২০৫৫ থেকে ২০৬০ সাল পর্যন্তও মিটারগেজ ট্রেন পরিচালনা চালিয়ে যেতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ কারণেই শুধু বর্তমান সংকট মেটাতে নয়, আগামী কয়েক দশকের প্রয়োজন বিবেচনা করেও নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের বর্তমান বহরের বড় অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নতুন ইঞ্জিন কেনা এখন আর শুধু আধুনিকায়নের বিষয় নয়; এটি অনেকটা পরিচালন সক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
পুরোনো ইঞ্জিনের কারণে প্রায়ই মেরামত, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সেবাবিঘ্নের সমস্যা দেখা দেয়। কোনো ইঞ্জিন দীর্ঘ সময় ওয়ার্কশপে থাকলে বিকল্প লোকোমোটিভের সংকট তৈরি হয়। এর ফলে ট্রেনের সময়সূচি ব্যাহত হতে পারে এবং কিছু ট্রেন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ যুক্ত হলে এই চাপ কিছুটা কমবে।
একই সঙ্গে প্রতি ট্রেনে পরিবহন সক্ষমতা বাড়তে পারে। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেনেও এর প্রভাব পড়বে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া মনে করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় কমবে এবং প্রতি ট্রেনের পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে।
এতে পরিবহন ব্যয়ও কমতে পারে।
রেলের গতি ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়লে আরও বেশি মানুষ সড়কের পরিবর্তে ট্রেন ব্যবহার করতে আগ্রহী হতে পারেন। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোর ওপর চাপ কিছুটা কমার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থায় বর্তমানে সড়কের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক বেশি। পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের একটি বড় অংশ সড়কপথে হয়ে থাকে। এর ফলে যানজট, জ্বালানি ব্যয় এবং সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বাড়ে।
রেলের সক্ষমতা বাড়লে এই ভারসাম্যে কিছুটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বে যাত্রী ও ভারী পণ্য পরিবহনে রেল সড়কের তুলনায় অধিক কার্যকর হতে পারে। নতুন লোকোমোটিভ সেই সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের যোগাযোগ ও পরিবহন খাতের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ইশতেহারে রেলকে জাতীয় পরিবহনের কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলা হয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন লোকোমোটিভ কেনাকে একটি অবকাঠামোগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে নতুন ইঞ্জিন কেনার পাশাপাশি পুরো রেলব্যবস্থার অন্যান্য সীমাবদ্ধতার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
লোকোমোটিভ আধুনিক হলেও রেললাইন, সিগন্যাল, স্টেশন অবকাঠামো, কোচ, ওয়াগন এবং রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা যদি একই গতিতে উন্নত না হয়, তাহলে নতুন ইঞ্জিনের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে।
বিশেষ করে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের সামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি কয়েক দশক ধরে মিটারগেজ চালাতে হয়, তাহলে নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ কার্যকর বিনিয়োগ হতে পারে। কিন্তু ডুয়েলগেজ রূপান্তর দ্রুত হলে ভবিষ্যৎ বহর ব্যবস্থাপনায় নতুন সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে প্রকল্পের বড় একটি অংশ বিদেশি ঋণনির্ভর হওয়ায় ঋণের শর্ত, পরিশোধ কাঠামো এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের দিকও বিবেচনায় রাখতে হবে।
১ হাজার ৯৫৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বিদেশি অর্থায়ন থেকে আসবে। ফলে প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা নির্ভর করবে নতুন লোকোমোটিভগুলো কত দ্রুত রেলের আয় ও সেবার সক্ষমতা বাড়াতে পারে তার ওপরও।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হলে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এর ফলে রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন ইঞ্জিনের কারণে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক কমে আসতে পারে। পুরোনো ইঞ্জিন সচল রাখতে যে ঘন ঘন মেরামত ও যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়, নতুন ইঞ্জিনে সেই ব্যয় শুরুতে তুলনামূলক কম থাকবে।
তবে নতুন প্রযুক্তির ইঞ্জিনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত যন্ত্রাংশ এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অতীতে অনেক অবকাঠামো প্রকল্পে দেখা গেছে, নতুন যন্ত্রপাতি কেনার পর পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যায়নি। এই প্রকল্পে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকায় সেই ঝুঁকি কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কেনার প্রকল্পটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা উন্নয়ন উদ্যোগ।
মোট ২ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার এই প্রকল্প অনুমোদিত হলে বহু পুরোনো ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে, ট্রেন পরিচালনার নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নতুন সক্ষমতা তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নতুন ইঞ্জিন কেনার ওপর নয়, বরং সেগুলোর সঠিক ব্যবহার, দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ, রেললাইন ও সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামগ্রিক রেল আধুনিকায়নের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।
এই সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ শুধু বহরের সংখ্যা বাড়াবে না; বরং বাংলাদেশের রেল যোগাযোগকে আরও দ্রুত, নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী করার পথও তৈরি করতে পারে।

