চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বিদেশ থেকে ৪ হাজার ৬০টি প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ২৭৩ দিনের হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ১৪টির বেশি মরদেহ আনা হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে সৌদি আরবে, প্রায় ২ হাজার জন। বিদেশে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে বলে জানিয়েছে ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা এখনো নেই।
কল্যাণ বোর্ডের হিসাবে ২০১৯ সালে দেশে এসেছিল ৩ হাজার ৬৫১টি মরদেহ। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪০-এ। ওই সময় অনেক পরিবার মরদেহ দেশে না এনে স্থানীয়ভাবে দাফন করেছিল। ২০২১ সাল থেকে আবার দেশে আসা মরদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকে। করোনাকাল বাদ দিলে সাধারণ সময়ে মৃতদের ১ শতাংশেরও কম গন্তব্য দেশে দাফন হয়।
সৌদি আরবের পরই সবচেয়ে বেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে মালয়েশিয়ায়। অথচ দেশটিতে গত আড়াই বছর ধরে নতুন করে কর্মী নেওয়া বন্ধ রয়েছে। এ বছরও সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরবেই। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসানের মতে, মোট মরদেহের ৭০ শতাংশের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার মধ্যে সৌদি আরবের অংশই বেশি। তিনি জানান, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণেরাও মারা যাচ্ছেন।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে সরকারি তথ্যে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগে প্রায় ৭০ শতাংশ মরদেহের সঙ্গে আসা কাগজে মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যু লেখা থাকত। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে এই হার নেমেছে ৬৬ শতাংশে। বাকি ৩৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে। সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়া ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন ১৬ শতাংশের বেশি কর্মী।
এর আগে ২০২৩ সালে পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিল কল্যাণ বোর্ড। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ওই পাঁচ বছরে মোট ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহ দেশে আসে। এর মধ্যে সড়ক ও কর্মস্থলের দুর্ঘটনা, আগুন, ভবন থেকে পড়া ও বৈদ্যুতিক শকে মারা যান ৩ হাজার ৬৯৮ জন। সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ৬৪৯ জন মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। সব মিলিয়ে ২০ শতাংশের বেশি প্রবাসী কর্মক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট নানা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। কর্মস্থলে যাতায়াত ও কাজের সময়ই এসব দুর্ঘটনা বেশি ঘটে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে নোয়াখালীর দুই ভাইয়ের ক্ষেত্রে। ফয়েজ আহম্মেদ ১০ বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করতেন। সাত মাস আগে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ছোট ভাই সুজন আহম্মেদ। দুজন একই গাড়িতে খেজুর পরিবহনের কাজ করতেন। গত ১৬ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় দুজনই মারা যান। ২৮ জুলাই তাঁদের মরদেহ দেশে আসে। বাবা আবদুল মালেক জানান, মরদেহ দাফনের জন্য কল্যাণ বোর্ড প্রতিজনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা করে মোট ৭০ হাজার টাকা দিয়েছে।
মরদেহ ফেরত আনার প্রক্রিয়া নিয়ে বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, মৃত্যুর পর পরিবারকে আবেদন করতে হয়। কর্মী যদি বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে গিয়ে থাকেন, অথবা বিদেশে গিয়ে দূতাবাস থেকে সদস্য নিবন্ধন করে থাকেন, তবে মরদেহ আনার খরচ বহন করে কল্যাণ বোর্ড। এর কোনোটি না থাকলেও পরিবার আবেদন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বোর্ড প্রস্তাব পাঠায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এবং মন্ত্রণালয় খরচ দেয়। এ জন্য প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরদেহ আনার আগে একাধিক দপ্তরের অনুমোদন লাগে, ফলে কিছুটা সময় যায়। তবে আগের চেয়ে এ সময় কমেছে বলে দাবি কর্মকর্তাদের। যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেখান থেকে মরদেহ আনতে সময় বেশি লাগে।
কম্বোডিয়ার ঘটনা তার একটি উদাহরণ। পাবনার আল আমিন দেশটির একটি টাইলস কারখানায় কাজ করতেন। কাজের সময় শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল তিনি মারা যান। তাঁর মরদেহ দেশে আসে গত ২৭ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ প্রায় দেড় বছর পর। কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস নেই। ব্র্যাকের সহায়তায় কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেন আল আমিনের শ্যালক মাসুম খান। আবেদনটি পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে অবস্থিত দূতাবাসে, কিন্তু মরদেহ কোথায় আছে, তা খুঁজে পায়নি তারা। শেষ পর্যন্ত মাসুম খান প্রবাসীদের মাধ্যমে স্থানীয় পুলিশের নম্বর জোগাড় করে বোর্ডকে সহায়তা করেন। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির মতে, কর্মী অনিয়মিত হয়ে গেলে, অর্থাৎ বৈধ কাগজ না থাকলে, মরদেহ আনতে দীর্ঘ সময় লাগে। নিয়মিত কর্মীর মরদেহ মোটামুটি সময়মতো আসে।
মৃত্যুর পর পরিবার যেসব আর্থিক সুবিধা পায়, তারও একটি কাঠামো আছে। দেশে আসা প্রতিটি মরদেহ দাফনের জন্য কল্যাণ বোর্ড ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয়। এরপর পরিবারকে দেওয়া হয় ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান। এখন জীবন বিমার সুবিধাও পায় পরিবার। বিদেশে কোনো ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া পাওনা থাকলে দূতাবাসের মাধ্যমে তা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দাফনের জন্য দেওয়া হয়েছে ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং আর্থিক অনুদান হিসেবে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বিমা সুবিধা বাবদ দেওয়া হয়েছে ৪৪ কোটি টাকার বেশি। বিদেশ থেকে ক্ষতিপূরণ, বকেয়া ও বিমা বাবদ আদায় হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।
তবে এসব সুবিধা পাওয়া নিয়ে অভিযোগও কম নয়। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আবেদনের পর দিনের পর দিন কল্যাণ বোর্ডে ঘুরতে হয়। অনেক সময় সহায়তা পেতে পেতে পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। আর বিদেশ থেকে সবকিছু হারিয়ে ফেরা অনিয়মিত কর্মীরা সরকারের এসব সুবিধা পান না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে মৃত্যুর কারণ নিয়ে। অভিবাসন খাতে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, কর্মী যে দেশে মারা যান, সেখান থেকে একটি কারণ লিখে পাঠানো হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেটি রোগসহ স্বাভাবিক মৃত্যু। অথচ কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, খুন বা আত্মহত্যায় বাধ্য করার অভিযোগও আছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মৃত্যুর কোনো কারণই যাচাই করা হয় না। দায়সারাভাবে কারণ জানিয়ে দেওয়াটা পরিবারের জন্য অসম্মানজনক বলেও মনে করেন তাঁরা।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ১ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে। মরদেহ দ্রুত দেশে আনতে কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ আনতেও সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদেশে মৃত্যুর কারণ যাচাইয়ে করণীয় ঠিক করা হবে বলেও জানান তিনি।
অভিবাসন খাতের গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অংশ অবকাঠামো নির্মাণে কাজ করেন। দিনের বেলা প্রচণ্ড তাপের মধ্যে তাঁদের কাজ করতে হয়। এতে কিডনি থেকে শুরু করে মস্তিষ্কসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওই অঞ্চলে তাপ আরও বাড়ছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রা বাড়লে শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্রোগ, বহুমূত্র ও কিডনি রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এতে অকালমৃত্যুও ঘটে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব মৃত্যুর কারণ জানা গেলে সরকার প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারবে।
প্রস্তুতির ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পাঠানোর আগে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয় বিএমইটি। সেখানে গন্তব্য দেশের নিয়মকানুন, আচার-আচরণ ও নিরাপত্তা সচেতনতা নিয়ে ধারণা দেওয়া হয়। কিন্তু এটি মাত্র তিন দিনের কর্মশালা, যেখানে কোনো কিছুই ভালোভাবে শেখানো হয় না। কর্মকর্তাদের মতে, যে দেশে কর্মী যাচ্ছেন, সেখানকার কাজের ধরন, পরিবেশ, চাপ সামলানোর কৌশল ও কর্মঘণ্টা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া দরকার। পাশাপাশি ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে সুস্থ রাখার প্রশিক্ষণও জরুরি।
শরিফুল হাসান বলেন, প্রতিটি মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ জানা গেলে মৃত্যু কমাতে সরকার ভূমিকা রাখতে পারবে। তিনি বিশেষভাবে নারী কর্মীদের আত্মহত্যার কারণ জোরালোভাবে খতিয়ে দেখার তাগিদ দেন। তাঁর মতে, মরদেহ দেশে আনতে কোনোভাবেই কালক্ষেপণ করা যাবে না। কর্মী অনিয়মিত হলেও তাঁর মরদেহ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু এখন নিয়মিত ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা। প্রতিদিন গড়ে ১৪টির বেশি পরিবার প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় থাকছে। স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখানো ঘটনার হার কিছুটা কমলেও কারণ যাচাইয়ের ব্যবস্থা না থাকায় এই হিসাবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, গন্তব্য দেশে কর্মপরিবেশ ও তাপজনিত ঝুঁকি নিয়ে নজরদারি, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অনিয়মিত কর্মীদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এসব মৃত্যু কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সহায়তা পেতে পরিবারগুলোকে যাতে হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে জন্য আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করা প্রয়োজন।

