মা ইলিশ রক্ষায় বুধবার (৭ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে পদ্মা ও মেঘনা নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ হচ্ছে। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে এই নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত, অর্থাৎ টানা ২২ দিন। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ এবং ক্রয়-বিক্রয়ও বন্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাঁদপুরের নদী ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় নজরদারি বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন।
মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল এলাকা থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার নদী এলাকা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে। এর মধ্যে মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত অংশে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে কাজ করবে। অভয়ারণ্য এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ৯টি খালের মুখ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রধান সড়কগুলোতে তল্লাশি চৌকি বসাবে জেলা পুলিশ। কোনো জরুরি পরিস্থিতি সামলাতে প্রস্তুত থাকবে দ্রুত সাড়া দেওয়ার একটি দল। এ ছাড়া এই ২২ দিন জেলার সব বরফকল বন্ধ রাখা হবে। ইলিশ সংরক্ষণ ও পরিবহনে বরফ অপরিহার্য হওয়ায় এই পদক্ষেপ অবৈধ মজুত ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সচেতনতা বাড়াতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। মাইকিং করা হচ্ছে, বিতরণ করা হচ্ছে নির্দেশনামূলক কাগজও। একই সঙ্গে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, এবার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নদীতে কোনো ধরনের বালু তোলার যন্ত্র চলতে দেওয়া হবে না। অন্য জেলা থেকে আসা জেলেরা যেন চাঁদপুরের সীমানায় ঢুকতে না পারেন, সে বিষয়েও নজরদারি থাকবে।
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে প্রজনন সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ ধরলে সংশ্লিষ্ট জেলেদের কমপক্ষে ছয় মাসের কারাদণ্ড হবে। তাঁদের জেলে পরিচয়পত্রও বাতিল করা হবে। নজরদারির স্বার্থে পাঁচটি অস্থায়ী পুলিশ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে।
নদীতে না নামা জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তার কথাও জানানো হয়েছে। চাঁদপুরের ৪১ হাজার ৩৯০ জন নিবন্ধিত জেলে ২৫ কেজি করে চাল পাবেন। পাশাপাশি এ সময়ে জেলেরা যেন ঋণের কিস্তির চাপে না পড়েন, সে জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ২২ দিনের জন্য ২৫ কেজি চাল জেলে পরিবারের প্রয়োজনের তুলনায় কতটা যথেষ্ট, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। সহায়তা সঠিক সময়ে ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছালে নিষেধাজ্ঞা মানার প্রবণতা বাড়বে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে চাঁদপুরের মাছঘাটে বেচাকেনা বেড়েছে। মঙ্গলবার সকালে বড়স্টেশন মাছঘাটে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক দিন ধরে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবু দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। আর ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দর কেজিপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা।
নিষেধাজ্ঞার আগে ক্রেতাদের হুড়োহুড়ি এবং দাম বাড়ার প্রবণতা প্রতিবছরই দেখা যায়। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় বাজারে ইলিশ বিক্রি ও মজুত বন্ধ থাকবে। তাই এ সময় বাজারে ইলিশ দেখলে তা অবৈধভাবে ধরা বা মজুত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইলিশ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাছগুলোর একটি। প্রজনন মৌসুমে ডিম ছাড়ার সুযোগ না পেলে পরের বছরগুলোতে উৎপাদন কমে যেতে পারে। তাই এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মানা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও জেলেদের জীবিকা, দুটিই সুরক্ষিত থাকবে। তবে সফলতা নির্ভর করবে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি, জেলেদের জন্য সহায়তার সময়োপযোগী বিতরণ এবং সাধারণ মানুষের সচেতন সহযোগিতার ওপর।

