সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি শাখায় অডিট চলাকালে শাখা ব্যবস্থাপক মো. আবদুস সালামের (৫০) মৃত্যু হয়েছে। বিষাক্ত কিছু খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ লোকজন ও ব্যাংকের কর্মীরা অডিট কমিটির সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ তিন সদস্যকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে অডিটের চাপই এ ঘটনার কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। অসুস্থ হওয়ার পর পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরা তাঁকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত নয়টার দিকে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
আবদুস সালাম নিমগাছী শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন। তাঁর বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায়। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি নিমগাছী এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
সহকর্মী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শাখাটিতে কয়েক দিন ধরে অডিট কার্যক্রম চলছিল। এ সময় আবদুস সালাম মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন বলে সহকর্মীরা জানান। শাখার কর্মী শফিকুল ইসলাম বলেন, অডিট চলাকালে ব্যবস্থাপককে বিষণ্ন মনে হচ্ছিল। কারণ জানতে চাইলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তাঁকে বাঁচতে দেওয়া হলো না। এরপর তিনি নিজের অসুস্থতার কথা জানান। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
শফিকুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা ও ব্যাংকের কর্মীরা অডিট কমিটির সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং কমিটির তিন সদস্যকে থানায় নিয়ে যায়।
রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান জানান, তিন সদস্যকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেননি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার ও গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ঘটনার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট নয়। সহকর্মীদের বক্তব্যে অডিট চলাকালে ব্যবস্থাপকের মানসিক চাপ ও হতাশার কথা এসেছে। কিন্তু সেই চাপ অডিট প্রক্রিয়ার কারণে তৈরি হয়েছিল কি না, অডিটে কোনো অনিয়ম বা আপত্তি উঠেছিল কি না, অথবা এর সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো বিষয় জড়িত ছিল কি না, তা জানা যায়নি। এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। তাই কোনো পক্ষকে দায়ী করার মতো তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
অডিট কমিটির সদস্যদের থানায় নেওয়ার ঘটনাটিও আলাদা করে বিবেচনার দাবি রাখে। উত্তেজিত পরিস্থিতিতে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের জন্য জরুরি ছিল। আবার জিজ্ঞাসাবাদ মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। অডিট ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি নিয়মিত ও বিধিসম্মত প্রক্রিয়া। তদন্তে তাঁদের আচরণে অসংগতি পাওয়া না গেলে তাঁদের দায় নেই। আবার কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তা আইন অনুযায়ী খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঘটনাটি একটি বড় প্রশ্নও সামনে আনে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অডিট বা নিরীক্ষা চলাকালে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কতটা মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন এবং সেই চাপ সামলাতে প্রতিষ্ঠানের কোনো সহায়ক ব্যবস্থা আছে কি না। কর্মক্ষেত্রের চাপ, জবাবদিহির ভয় কিংবা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা যেকোনো মানুষকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। তাই সহকর্মীদের সময়মতো লক্ষ্য করা, কথা বলা এবং প্রয়োজনে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি।
এখন নজর থাকবে পুলিশের তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেদিকে। নিহতের পরিবার কোনো অভিযোগ করে কি না এবং গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে কি না, সেটিও দেখার বিষয়। এসব তথ্য সামনে এলেই ঘটনার সঠিক চিত্র স্পষ্ট হবে।

