দেশে অন্ধত্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই ছানিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন। অথচ এই বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে ছানি অস্ত্রোপচারে দক্ষ সার্জনের সংখ্যা খুবই কম। ফলে সহজে চিকিৎসাযোগ্য একটি রোগ এখনো দেশের বহু মানুষের দৃষ্টিহীনতার কারণ হয়ে আছে। আজ বিশ্ব দৃষ্টি দিবসে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, দেশে নিবন্ধিত চক্ষু বিশেষজ্ঞ দুই হাজারের বেশি। কিন্তু ছানি অস্ত্রোপচারে সক্রিয় ও অভিজ্ঞ সার্জন আছেন ৪০০ থেকে ৮০০ জন। অপেক্ষমাণ রোগীর হিসাবে গড়ে ৮৩৩ জনের জন্য একজন দক্ষ সার্জন রয়েছেন। এর ওপর প্রতিবছর নতুন করে এক লাখের বেশি মানুষ ছানির রোগী হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। এতে অপেক্ষমাণ রোগীর তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট শুধু সার্জনের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসাসেবা না পৌঁছানো, রোগী শনাক্তকরণে দুর্বলতা, সচেতনতার অভাব এবং নারী-পুরুষের মধ্যে চিকিৎসা পাওয়ার বৈষম্যও ছানি চিকিৎসার পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
এবার বিশ্ব দৃষ্টি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘লাভ ইউর আইস’, অর্থাৎ চোখকে ভালোবাসুন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা, প্রয়োজনমতো চশমা ব্যবহার করা এবং ছানি ধরা পড়লে দ্রুত অস্ত্রোপচার করালে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্ধত্ব ঠেকানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রায় ১০ লাখ মানুষ এখন ছানিজনিত অন্ধত্বের দীর্ঘ জটে আটকে আছেন। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ রোগীর ছানি অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা আছে। কিন্তু নতুন রোগী যুক্ত হওয়ায় প্রতিবছরই বড় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। তাঁর মতে, আগামী পাঁচ বছর প্রতিবছর অতিরিক্ত অন্তত দুই লাখ অস্ত্রোপচার করতে না পারলে জমে থাকা রোগীর সংখ্যা কমানো কঠিন হবে। এ জন্য রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে জেলা হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে সক্ষম করে তুলতে হবে।
দেশের অন্যতম প্রধান সরকারি চক্ষুসেবা কেন্দ্র রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। সেখানে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু হাসপাতালটির জনবল কাঠামো মাত্র ২৫০ শয্যার, ফলে এত চাপ সামলাতে প্রতিষ্ঠানটিকে হিমশিম খেতে হয়। প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৩০ জনের ছানি অস্ত্রোপচার হয়। প্রয়োজনীয় লেন্সও রোগীদের বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক ডা. রেজওয়ানুর রহমান বলেন, এই কাঠামো নিয়ে প্রতিদিন এত রোগীকে সেবা দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়াকে অনেকে স্বাভাবিক ধরে নেন। অথচ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি জানান, চোখের প্রাকৃতিক লেন্স ঘোলা হয়ে গেলে দৃষ্টি কুয়াশাচ্ছন্ন বা ঝাপসা হয়ে যায়। দিনের তীব্র আলো কিংবা গাড়ির হেডলাইটের সামনে দেখতে সমস্যা হওয়া ছানির অন্যতম লক্ষণ। অনেকের ক্ষেত্রে রাতে দেখতে অসুবিধা হয়, আবার কারও কাছের জিনিস তুলনামূলক স্পষ্ট দেখা যায়।
এই চিকিৎসকের ভাষ্য, ছানির রোগীদের বড় অংশই বয়স্ক ও গ্রামের মানুষ। হাসপাতালে যাতায়াতের খরচ, সঙ্গে একজনকে নেওয়ার প্রয়োজন এবং চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণার অভাবে অনেকে অস্ত্রোপচার করাতে পারেন না। নারীরা এ ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে। দেশের আট জেলায় ২১ হাজার ৫৯৬ জনের ওপর করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছানি অস্ত্রোপচারের হার পুরুষদের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও নারীদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
জাতীয় অন্ধত্ব জরিপ-২০২০ অনুযায়ী, দেশে ৩০ বছর ও তার বেশি বয়সীদের মধ্যে অন্ধত্বের হার প্রায় ১ শতাংশ। এই বয়সী প্রতি ১০০ জনের প্রায় পাঁচজন কোনো না কোনো মাত্রার দৃষ্টিসমস্যায় ভুগছেন। আনুমানিক ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৩ জন অন্ধত্ব নিয়ে বাস করছেন, যাঁদের মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের অন্ধত্বের কারণ ছানি।
তবে সময়ের সঙ্গে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। ২০০০ সালের জরিপে বয়স ও লিঙ্গ সমন্বয় করা অন্ধত্বের হার ছিল ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২০ সালে তা কমে ১ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ দুই দশকে অন্ধত্বের হার কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ধত্ব কমলেও চিকিৎসাযোগ্য অন্ধত্বের বোঝা এখনো বড়। গুরুতর দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণও ছানি।
শুধু ছানিই নয়, চশমার অভাবেও লাখো মানুষ দৃষ্টিসমস্যায় ভুগছেন। দেশের ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের কোনো না কোনো ধরনের দৃষ্টিত্রুটি আছে, অথচ চশমা ব্যবহারের সুযোগ পান মাত্র ২৬ শতাংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে চালসে, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি ও গ্লুকোমার ঝুঁকিও বাড়ে। স্কুলের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের মধ্যেও অনেক সময় দৃষ্টিসমস্যা শনাক্ত হয় না।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা বলেন, গত ২০ বছরে অন্ধত্ব নিরসনে বড় সাফল্য এসেছে। আশা করা যায়, ধীরে ধীরে এই সংখ্যা আরও কমবে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালে ছানি অস্ত্রোপচার ও চোখের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে হয়, আর বেসরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে সেবা মেলে। প্রান্তিক এলাকায় জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদায়নের মাধ্যমে চশমার পাওয়ার নির্ধারণ, ছানি ও নেত্রনালির রোগ শনাক্তকরণ এবং অস্ত্রোপচারের মতো মৌলিক সেবা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, আগামী পাঁচ বছরে ছানি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন আছে এমন সব রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা।
সবকিছু মিলিয়ে চিত্রটি মিশ্র। একদিকে দুই দশকে অন্ধত্বের হার কমেছে, সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে সেবা মিলছে। অন্যদিকে সার্জনের স্বল্পতা, রাজধানীকেন্দ্রিক সেবা কাঠামো, গ্রামীণ ও বয়স্ক মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং নারীদের পিছিয়ে থাকা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। জেলা পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ানো ও সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে জমে থাকা ১০ লাখ রোগীর দৃষ্টি ফেরার সম্ভাবনা।

