আবাসিক এলাকায় সড়ক নির্মাণে এখন থেকে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্মাণের পর তিন বছরের মধ্যে সড়ক বা অন্য কোনো অবকাঠামোয় বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে তা নিজ খরচে মেরামত করে দিতে হবে ঠিকাদারকে। এ জন্য প্রকল্পের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভা শেষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন অবকাঠামো, স্থাপনা ও সড়ক নির্মাণে টেকসই ও গুণগত মানকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। নির্মাণের পর তিন বছরের মধ্যে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে ঠিকাদারকে তা আবার ঠিক করে দিতে হবে। এ জন্য চুক্তিতে প্রয়োজনীয় গ্যারান্টি বা দায়বদ্ধতার শর্ত যুক্ত করা হবে। তিনি স্পষ্ট করেন, এটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় নয়। নির্মাণের মানের কারণে বড় ক্ষতি হলে তার দায়িত্ব ঠিকাদারকেই নিতে হবে।
ড্রেনেজ নিয়ে সরকারের উদ্বেগের কারণও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যায়ে সড়ক নির্মাণে নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকাকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে অনেক ক্ষেত্রে সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তাই আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে যাওয়া যেকোনো সড়কের পরিকল্পনায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ড্রেনেজের সুবিধা না রেখে ভবিষ্যতে আর কোনো সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হবে না।
শুধু ড্রেন বানালেই চলবে না, সেই ড্রেন বা পয়োনিষ্কাশন লাইন দিয়ে পানি কোথায় যাচ্ছে, তাও নিশ্চিত করতে হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। নদীতে পানি ফেলার আগে পরিশোধনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এ জন্য পয়োনিষ্কাশন লাইনকে পয়োশোধনাগারের (এসটিপি) সঙ্গে সমন্বিতভাবে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় অবকাঠামোর মানের পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় কমানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়। সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে গাড়ি কেনার ব্যবস্থা বাদ দিতে বলা হয়েছে। পরামর্শক ব্যয়ও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ এসেছে। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জনবল থাকলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পরামর্শক ব্যয় বাড়ানো যাবে না বলেও জানানো হয়েছে।
রেলপথ নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের রেলপথের প্রায় ৬৫ শতাংশই মিটারগেজ। কিন্তু প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভের ঘাটতির কারণে ইতিমধ্যে কিছু রুট স্থগিত, বাতিল বা কমিয়ে দিতে হয়েছে। এতে পণ্য পরিবহনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বর্তমানে আরও ৭০ থেকে ৮০টি লোকোমোটিভ দরকার। প্রথম ধাপে ৩০টি লোকোমোটিভ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে একনেক সভায় ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করতে রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। অনুমোদিত অর্থের মধ্যে সরকারি খাত থেকে আসবে ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রকল্প ঋণ হিসেবে মিলবে ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করবে ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অনুমোদিত ১৩টি প্রকল্পের ১০টি সম্পূর্ণ নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প।
সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ ও অপচয় নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই সড়ক ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শোনা যায়। এ প্রেক্ষাপটে তিন বছরের গ্যারান্টি ক্লজ ঠিকাদারদের জবাবদিহির আওতায় আনার একটি পদক্ষেপ হতে পারে। তবে চুক্তিতে এই শর্ত রাখা এবং বাস্তবে তা কার্যকর করার ওপরই নির্ভর করবে নির্দেশনার সফলতা।

