দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত ও সেকেলে নিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও স্রেফ নিজস্ব জমি বা বাড়ির মালিকানা না থাকায় অনেক প্রার্থীর নিয়োগ আটকে যাচ্ছে। অর্থাৎ, মেধা যাচাইয়ের চূড়ান্ত ধাপ পেরিয়েও তথাকথিত ‘স্থায়ী ঠিকানা’ প্রমাণ করতে না পারায় সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দেশের অসংখ্য সাধারণ নাগরিক। এই ব্যবস্থাটি এমন এক সময়ে চলমান, যখন জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক গ্রাম ছেড়ে শহরে বা ভাড়া বাড়িতে জীবনযাপন করছেন, যা চরম বাস্তবতার সাথে প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার এক বিশাল দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এই অসংগতির একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন মিশন আচার্য। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হন। কিন্তু ১৮২ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৮০ জন নিয়োগপত্র পেলেও মিশনের অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছিল না। কারণ হিসেবে জানা যায়, ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় মায়ের সাথে কয়েক দশক ধরে ভাড়া বাড়িতে বসবাস করা এই প্রার্থীর নিজস্ব কোনো জমি বা বসতবাড়ি নেই। পুলিশ ভেরিফিকেশনে তার স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খানের মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নজরে আসে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগ চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেন এবং কর্মকর্তাদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানতে চান, সরকারি চাকরি পেতে প্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে জমির মালিকানা থাকতে হবে, এমন কথা সংবিধানের কোথায় লেখা আছে?
সমস্যাটি অবশ্য মোটেও নতুন নয়। টিবিএসের প্রতিবেদনে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ২০২১ সালে বরিশালের আসপিয়া ইসলাম পুলিশ কনস্টেবল পদে সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও কেবল ভূমিহীন হওয়ার কারণে নিয়োগ জটিলতায় পড়েছিলেন। নদীভাঙনে ভোলায় ভিটেমাটি হারিয়ে তারা ১৫ বছর ধরে বরিশালে বসবাস করছিলেন। পরে সরকারি হস্তক্ষেপে তিনি চাকরি পেলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে; নদীভাঙন বা দারিদ্র্যের কারণে কেউ ভূমিহীন হলে তিনি কি ওই নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দা হিসেবে গণ্য হবেন না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান এই প্রথার শেকড় খুঁজতে গিয়ে জানান, প্রার্থীর অতীত যাচাইয়ের এই প্রথাটি মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের। সেসময় চাকরিতে প্রবেশকারীরা ব্রিটিশবিরোধী বা স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত কি না, তা যাচাই করা হতো। পাকিস্তান আমলেও এই ধারা অব্যাহত ছিল, আর স্বাধীন বাংলাদেশেও তা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। যুগ যুগ ধরে এই প্রথার বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, কারণ ক্ষমতাবানদের কখনোই এই ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়নি বিধায় এটি পরিবর্তনের কোনো চাপ তৈরি হয়নি।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার এই ব্যবস্থার অকার্যকর দিকটি তুলে ধরেছেন। তার মতে, লাখ লাখ বাংলাদেশি, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, ভাড়া বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বড় হয়েছেন। তাদের পৈতৃক বাড়ি হয়তো বিক্রি হয়ে গেছে, নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অথবা তাদের কখনোই কোনো জমি ছিল না। তিনি যুক্তি দেন, একটি রাষ্ট্রের উচিত প্রার্থীর জমির মালিকানার চেয়ে তার বসবাসের ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া। গত পাঁচ বছর একজন ব্যক্তি কোথায় বসবাস করেছেন এবং সেই ঠিকানার সাথে তার সম্পর্ক কী; এটাই যাচাইয়ের মূল বিষয় হওয়া উচিত। সম্প্রতি পালিত হওয়া বিশ্ব বসতি দিবসে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, বিশ্বজুড়ে শত শত কোটি মানুষের পর্যাপ্ত আবাসন নেই। অথচ বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনো মনে করে, একটি জমির দলিলের মাধ্যমেই কেবল কোনো ব্যক্তির সাথে একটি নির্দিষ্ট এলাকার সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব।
স্থায়ী ঠিকানার নামে জমির মালিকানা খোঁজাটা খোদ আইনের সাথেই সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি নিয়োগে জন্মস্থান বা বাসস্থানের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি একাদিক্রমে তিন বছর কোনো স্থানে বসবাস করলে সেটি তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে গণ্য হবে। নদীভাঙনে ঠিকানা বিলীন হয়ে যাওয়া মানুষদেরও এখানে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মূলত, স্থায়ী ঠিকানা হলো বসবাসের একটি অবস্থা, আর সম্পত্তির মালিকানা হলো সম্পদের অধিকার। একটির সাথে অন্যটির কোনো আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। অধ্যাপক সাদিক হাসান মনে করেন, এই পুরোনো ব্যবস্থা বাতিলের জন্য নতুন করে কিছু আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রেই (এনআইডি) যে ভোটার এলাকা যুক্ত থাকে, সেটিকে ভেরিফিকেশনের ভিত্তি হিসেবে অনায়াসেই ব্যবহার করা যায়।
আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো প্রস্তুত থাকলেও মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেকেলে প্রশাসনিক অভ্যাস। একজন নাগরিক সারা জীবন ভাড়া বাড়িতে কাটিয়ে, সেখানেই পড়াশোনা করে এবং সামাজিক পরিচিতি গড়ে তুলেও এক টুকরো জমির অভাবে নিজের স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ দিতে পারছেন না। জন্ম নিবন্ধন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভোটার তথ্য, নাগরিকত্ব সনদ এবং ইউটিলিটি বিলের মতো ডিজিটাল ডেটাবেজ ব্যবহার করে এখন সহজেই একজন নাগরিকের আবাসিক ইতিহাস যাচাই করা সম্ভব। বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঠিক কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, তার একটি যুগোপযোগী ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

