বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় এখন বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। কারণ, একদিকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন নেই, অন্যদিকে এর উৎপাদন খরচও অনেক ক্ষেত্রে তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় কম।
এরই মধ্যে দেশের কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দেখিয়েছে, নবায়নযোগ্য শক্তি শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, অর্থনৈতিকভাবেও কার্যকর হতে পারে। ২০২৪ সালে পাবনার ভবানীপুরে চালু হওয়া ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র তার একটি উদাহরণ। পদ্মার বিস্তীর্ণ বালুচরের ৪০০ একর জমির ওপর নির্মিত এই কেন্দ্র দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের সময়ে এই ধরনের প্রকল্পের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। যখন তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে, তখন সৌরবিদ্যুৎ তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে। একই সঙ্গে এতে জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার কমে এবং পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও কম থাকে।
ভবানীপুর সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে ২০২১ সালে করা ২০ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে সাড়ে ১১ সেন্ট, যা বর্তমানে প্রায় ১৩ টাকার সমান। অন্যদিকে ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ২৮ টাকার বেশি এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের খরচ প্রায় ১৫ টাকার কাছাকাছি। ফলে ব্যয়ের দিক থেকে সৌরবিদ্যুৎ একটি প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতি এখনও সীমিত। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর বেশি নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৩৪৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌর, পানি ও বায়ুভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ৮৯ মেগাওয়াট। গ্রিডে যুক্ত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৪ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করলে এই সক্ষমতা কিছুটা বাড়ে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে গ্রিডে যুক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তবে এটিও মোট বিদ্যুৎ ব্যবস্থার তুলনায় এখনও ছোট অংশ।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য পূরণও এখনো পিছিয়ে রয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা অর্জিত হয়নি। পরে ২০২৫ সালের মধ্যে একই লক্ষ্য পূরণের কথা বলা হলেও সেটিও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হলেও এর মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ গেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে।
বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সরকারি জমিতে বড় প্রকল্প এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে নতুন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনের কথাও তিনি জানান।
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পথে অবশ্য কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বড় প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া, অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন কিছু প্রকল্পে অর্থায়ন ও জমি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে আসা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে আগে অনুমোদন পাওয়া কিছু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও নতুন করে আলোচনা চলছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতিল হওয়া ৩১টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতো এবং প্রায় ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ আসতে পারত। তবে বিদ্যুতের দাম ও প্রকল্পের শর্ত নিয়ে এসব উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে দ্রুত এগিয়েছে। ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। ভিয়েতনাম ২০১৮ সালে মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা থেকে ২০২৫ সালের শেষে প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতায় পৌঁছেছে। পাকিস্তানেও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে।
বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে প্রায় ৩৬ লাখ একর খাসজমি এবং ১৮ লাখ একর অকৃষিজমি রয়েছে। এসব জমির একটি অংশ ব্যবহার করে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চরাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার একর জমি ব্যবহার করেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য জানিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং ছাদভিত্তিক বিদ্যুতের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিট ছাদবিদ্যুৎ সাড়ে ১০ টাকায় কেনার পরিকল্পনাও বাজারে আগ্রহ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প তুলনামূলক কম সময়ে বাস্তবায়ন করা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। বড় ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি দ্রুত ছাদভিত্তিক ও জমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার চাপ কমাতে পারবে।
জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের এই সময়ে সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুতের বিকল্প উৎস নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ বিনিয়োগ কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

