রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহনযোগ্য (পোর্টেবল) এক্স-রে মেশিনটি প্রায় আট মাস আগে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি পুড়িয়ে দিয়ে গেছেন। এরপর থেকে মেশিনটি ওই অবস্থাতেই পড়ে আছে। মেরামত হয়নি, নতুন মেশিনও কেনা হয়নি। ফলে মুমূর্ষু রোগীদের এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে মেশিন ভাড়া করে এক্স-রে করাতে হচ্ছে। এতে খরচ পড়ছে হাসপাতালের নির্ধারিত ফির তুলনায় পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, যেসব গুরুতর অসুস্থ রোগীকে রেডিওলজি বিভাগে নেওয়া সম্ভব হয় না, তাঁদের জন্য পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন ওয়ার্ডে এনে ছবি তোলা হয়। এ কাজের জন্য হাসপাতালে দুটি মেশিন ছিল। এর একটি পুরোনো মডেলের, যা আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অন্যটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন হাসপাতালে কোনো পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন নেই।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জানুয়ারি ভোরে। হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সারা দিন ব্যবহারের পর মেশিনটি রেডিওলজি বিভাগে নিয়ে রাখার কথা। কিন্তু পোড়ানোর কয়েক দিন আগে থেকে রাতে সেটি ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নার্সিং ডেস্কের পাশে রাখা হতো। সেখানেই আগুন দেওয়া হয়।
পরের দিন হাসপাতালের পক্ষ থেকে রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানায় মামলা করা হয়। এজাহারে সিসি ক্যামেরার ফুটেজের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২৮ জানুয়ারি ভোর চারটা আট মিনিটে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি হাসপাতালে অনধিকার প্রবেশ করেন। তিনি ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে রাখা পোর্টেবল এক্স-রে মেশিনে আগুন ধরিয়ে দ্রুত সরে পড়েন। কর্তব্যরত নার্স ও ওয়ার্ড বয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তত ক্ষণে মেশিনটি পুড়ে পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আকরাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মেশিন পোড়ানোর ঘটনায় কোনো আসামিকে শনাক্ত করা যায়নি। ভিডিওতে যে ব্যক্তিকে দৌড়ে যেতে দেখা গেছে, তাঁর পরিচয়ও জানা যায়নি। এ কারণে আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা যাবে বলে তিনি জানান।
এ ঘটনায় হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক তৌফিকুল ইসলামকে সভাপতি করে নয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, দোষীদের শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের সুপারিশসহ সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। অধ্যাপক তৌফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, তাঁরা যথাসময়ে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। এ বিষয়ে কিছু বলার থাকলে পরিচালকই বলতে পারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে প্রতিবেদনে কী আছে, তা জানা যায়নি।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ-উল-ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন না। হাসপাতালের মুখপাত্র শেখ শামীম আহমেদ বলেন, গত বছর নতুন পরিচালকের যোগদান ও আগের পরিচালকের বিদায়ের সময় ভালো মেশিনটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যায়নি। মেশিনটি মেরামতের জন্য ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপকে (নিমিউ) একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সাড়া মেলেনি।
তিনি জানান, গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে নিমিউয়ের কর্মকর্তারা রাজশাহীতে এসে বলেছেন, মেশিন মেরামতের জন্য শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে। তাঁরা নতুন মেশিনেরও চাহিদা দিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে সময় লাগবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পোড়া মেশিনটি এখন রেডিওলজি বিভাগের দুই নম্বর সিটি স্ক্যান কক্ষে তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। সেখানে একটি নষ্ট সিটি স্ক্যান মেশিনও রয়েছে। মেশিনটির ছবি তুলতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি মেলেনি।
এই আট মাসে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্রের পোর্টেবল এক্স-রের পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। সেখানে ছুটির দিনেও যত্নসহকারে এক্স-রে করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের পোর্টেবল এক্স-রে চালু থাকার সময় মাত্র ২২০ টাকায় বুকের এক্স-রে করা যেত। এখন বাইরের ব্যবসায়ীরা এসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন।
যাঁদের নড়াচড়ার সামর্থ্য নেই, সেই মুমূর্ষু রোগীদের জন্য পোর্টেবল এক্স-রে প্রায়ই জরুরি হয়ে ওঠে। সরকারি হাসপাতালে সেই সুবিধা না থাকায় সবচেয়ে বিপাকে পড়ছেন নিম্নআয়ের রোগীরা। আট মাসেও মেরামত বা নতুন মেশিন কেনার কাজ শুরু না হওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতারই ইঙ্গিত দেয়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কেউ শনাক্ত না হওয়ায় হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখন নজর থাকবে, নিমিউ কত দ্রুত দরপত্র ডাকে এবং রোগীরা কবে নাগাদ সরকারি হারে এই সেবা ফিরে পান।

