রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এর ফলে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। সব প্রস্তুতি পরিকল্পনা অনুযায়ী শেষ হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া গত সেপ্টেম্বরে শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় সেই সময়সূচি পিছিয়ে যায়। পরে গত সপ্তাহে উচ্চচাপে দুই দফা পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনার পর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার পরবর্তী ধাপের অনুমোদন দেয়।
কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদ হাসান জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে প্রথম ইউনিটের পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার থেকেই এই কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং দু-তিন দিনের মধ্যে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এর আগে নিরাপত্তা ভালভের দুটি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণ ভালভগুলো নির্ধারিতভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়েছে।
কেন্দ্রটির কর্মকর্তারা জানান, চুল্লির ভেতরের চাপ নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ভালভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে এই ব্যবস্থা তা কমিয়ে নিরাপদ মাত্রায় রাখতে সহায়তা করে। তাই প্রথম ইউনিট চালুর আগে এই পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এখন রূপপুরের সামনে বড় ধাপ হলো পারমাণবিক বিক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায় বা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। বিক্রিয়া শুরু হওয়ার কিছুদিন পর এই পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা। তখন আরও বিভিন্ন পরীক্ষা ও যাচাই করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় ৩০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে চুল্লির শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
পারমাণবিক জ্বালানির বিভাজন বিক্রিয়া থেকেই তাপশক্তি উৎপন্ন হবে। সেই তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি করা হবে এবং বাষ্পের চাপে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
কেন্দ্রটির প্রস্তুতি এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। চুল্লিতে শক্তি উৎপাদন শুরু হওয়ার পর উৎপাদনক্ষমতা ধাপে ধাপে ৩ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। উৎপাদনক্ষমতা ৩০ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। সে পর্যায়ে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে, যা ডিসেম্বরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার পর পরীক্ষামূলকভাবে সাত থেকে আট মাস কেন্দ্রটি পরিচালিত হতে পারে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর পর কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক স্থাপনার স্বীকৃতি পায়। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে সেই প্রক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
রূপপুরের একটি ইউনিট থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় দেড় বছর পরপর নতুন জ্বালানি দেওয়ার প্রয়োজন হবে। জ্বালানি বর্জ্য অপসারণ, নতুন জ্বালানি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি ইউনিট সর্বোচ্চ প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।
কেন্দ্রটির একটি ইউনিট চালু হলে বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় হতে পারে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রকল্পটি প্রায় সাড়ে তিন বছর পিছিয়ে গেছে।
রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে ডলারের বিনিময়মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিট থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

