রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা, যানজট এবং অনিয়ম কমাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচলের কারণে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, তা নিয়ন্ত্রণে এনে একটি পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার প্রতিটি নির্ধারিত রুটে একাধিক কোম্পানির পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস পরিচালনার ব্যবস্থা চালু করা হবে।
গত বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ সচিবালয়ে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হবে, যেখানে বাস চলাচল হবে নির্দিষ্ট নিয়ম, সময়সূচি এবং ব্যবস্থাপনার আওতায়।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকাকে ৩২টি রুটে ভাগ করে প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা করা হবে। নতুন ব্যবস্থায় যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বাস স্টপেজ, কাউন্টারভিত্তিক টিকিট ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক টিকিট এবং বাসের অবস্থান পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি এবং সড়কে বাসের অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা কমানোর চেষ্টা করা হবে।
ঢাকার বর্তমান গণপরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল। যাত্রী সংগ্রহের জন্য অনেক সময় বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এর ফলে বাস চালকরা দ্রুত যাত্রী নেওয়ার চেষ্টা করেন, যেখানে সেখানে বাস থামান এবং অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সমন্বিত বাস ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে এই ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানিকে একীভূত করে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাস মালিকরা তাদের বিনিয়োগের অনুপাতে লাভ পাবেন এবং চালক ও শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক নয়, বরং মাসিক বেতনভিত্তিক কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে চালকদের ওপর অতিরিক্ত যাত্রী সংগ্রহের চাপ কমবে এবং সেবার মান উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ঢাকার গণপরিবহনে এই ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৪ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় রাজধানীতে বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ আলোচনা ও পরিকল্পনার পর ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস সেবা চালু করা হয়েছিল।
ওই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্স-সিলভা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিআরটিসি যৌথভাবে বাস পরিচালনা করেছিল। সেখানে নির্ধারিত কাউন্টার, বৈদ্যুতিক টিকিট ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট স্টপেজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তবে অন্যান্য পরিবহন কোম্পানির বাসগুলোকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব না হওয়ায় উদ্যোগটি স্থায়ীভাবে চালু রাখা যায়নি। ফলে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যাত্রী ছাউনিগুলোর অনেকগুলো পরবর্তীতে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে অনুমোদিত বাস রুটের সংখ্যা ৪১৮টি। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৯৮টি রুটে বাস চলাচল করছে। এসব সচল রুটে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাস পরিচালিত হচ্ছে। তবে বাস্তবে অনেক অনুমোদিত রুট ও কোম্পানির কার্যক্রম নেই। আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করায় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন পরিকল্পনায় এসব সমস্যা দূর করে পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন রুট পরিকল্পনা তৈরির জন্য ৫২টি স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি কার্যকর রুট নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস সরিয়ে নেওয়া। রাজধানীর রাস্তায় চলাচলকারী অনেক বাসের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নের মুখে রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় যেসব বাসের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হবে। আর যেসব বাস চলাচলের উপযোগী, সেগুলো নির্ধারিত মান বজায় রেখে পরিচালনার সুযোগ পাবে।
নতুন ব্যবস্থায় বাস নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়বে, নির্ধারিত স্থানে থামবে এবং চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক আচরণ কমানোর চেষ্টা করা হবে। একই রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে আগে যাত্রী নেওয়ার জন্য যে প্রতিযোগিতা দেখা যায়, সেটি বন্ধ করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। এর ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সময় ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করা। ঢাকার পরিবহন খাতের সঙ্গে হাজারো বাস মালিক, শ্রমিক এবং বিভিন্ন সংগঠন যুক্ত। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু পরিকল্পনা করলেই সফলতা আসে না; প্রয়োজন কার্যকর সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম জানিয়েছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে রুট নির্ধারণ, বাস স্টপেজ নির্বাচন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার কাজ করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে প্রস্তাবিত ৩২টি রুটে নতুন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
ঢাকার মতো জনবহুল শহরে একটি আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। কারণ পরিবহন শুধু মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি শহরের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক জীবনের গতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একটি পরিকল্পিত বাস ব্যবস্থা চালু হলে যানজট কমানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। দীর্ঘদিনের পুরোনো পরিবহন সংস্কৃতির পরিবর্তন সহজ নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে যদি এই ব্যবস্থা কার্যকর করা যায়, তাহলে ঢাকার গণপরিবহনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

