মানসিক অসুস্থতাকে ঘিরে থাকা ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করতে সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ ১০ অক্টোবর, শনিবার বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার দেওয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকারি সেবা তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে একাধিক উদ্যোগের কথাও তিনি জানিয়েছেন।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যের একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, শুধু দেখতে সুস্থ থাকা বা রোগমুক্ত থাকাই স্বাস্থ্য নয়। শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকাই প্রকৃত সুস্বাস্থ্য। এই ধারণা অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য আলাদা কোনো বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দিবসটির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য শুধু চিকিৎসার প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের মর্যাদা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কেউ মানসিক সমস্যায় ভুগলে তাঁকে অবহেলা বা একঘরে করা যাবে না। বরং তাঁর কথা শুনতে হবে, পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ করতে হবে।
এ বছরের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Lived experiences heard: real voices, real change’, অর্থাৎ বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনা, প্রকৃত কণ্ঠস্বর, প্রকৃত পরিবর্তন। এ প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাঁরা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করাই প্রকৃত পরিবর্তনের পূর্বশর্ত।
সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে কয়েকটি কাজ চলছে। প্রান্তিক মানুষের কাছে সেবা নিয়ে যেতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। টেলি-কাউন্সেলিং সম্প্রসারণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সরকারি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও চলছে। এর পাশাপাশি গর্ভবতী মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য, শিশু-কিশোরদের সুস্থতা এবং স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তরিকতা ও মনোযোগ দিয়ে মানুষের কথা শুনতে হবে। সহমর্মিতার সঙ্গে পাশে দাঁড়াতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকতে হবে।
একটি কল্যাণমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার, স্বাস্থ্য পেশাজীবী, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি সুস্থ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে কেউ সংকোচ করবেন না। সাহায্য চাইতে কেউ লজ্জা পাবেন না এবং নিজেকে একা বা অবহেলিত ভাববেন না। বাণীর শেষে তিনি দেশ ও বিশ্বের সব মানুষের সুস্থতা ও কল্যাণ কামনা করেন এবং দিবসটির সাফল্য প্রত্যাশা করেন।
বাণীর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট। কুসংস্কার ও লজ্জাকে প্রধানমন্ত্রী মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পথে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশে মানসিক সমস্যাকে অনেক সময় দুর্বলতা, পারিবারিক কলঙ্ক বা অলৌকিক কারণের ফল হিসেবে দেখা হয়। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন, কখনো যানই না। ফলে সমস্যা জটিল হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান সেই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলের তাগিদ হিসেবেই পড়া যায়।
তৃণমূলে রেফারেল ব্যবস্থা ও টেলি-কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগও এখানে প্রাসঙ্গিক। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা সীমিত এবং তাঁদের বড় অংশ বড় শহরে কাজ করেন। ফলে গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকার মানুষের পক্ষে সেবা পাওয়া কঠিন। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সেবা সংযুক্ত করা গেলে এই দূরত্ব কিছুটা কমতে পারে। তবে বাণীতে এসব উদ্যোগের সময়সীমা, বরাদ্দ বা অগ্রগতির সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। তাই বাস্তবে এর প্রভাব কতটা হবে, তা সামনের দিনগুলোতে বোঝা যাবে।
গর্ভবতী মা, শিশু-কিশোর ও স্কুলভিত্তিক সেবার ওপর জোর দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের শুরুর দিকে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যা অনেকটা এড়ানো সম্ভব, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সাধারণ ঐকমত্য আছে।
সব মিলিয়ে দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বাণী মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আনার একটি বার্তা। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হয় এবং সাধারণ মানুষ সহজে ও সম্মানের সঙ্গে সেবা পান কি না।

