রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা শাহবাগ। চারপাশে সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও নানা ধরনের মানুষের চলাচল। দিনের বেলায় যেখানে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে, সেই এলাকাতেই নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক মানুষের জীবন। মৃত্যুর পরও তাদের পরিচয় মিলছে না, জানা যাচ্ছে না তাদের পরিবার বা অতীতের গল্প।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে শাহবাগ থানা এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে ৭৯টি মরদেহ। এর মধ্যে মাত্র ১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬৫ জনই রয়ে গেছেন অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে। পরিচয় না পাওয়ায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
শুধু চলতি বছর নয়, গত কয়েক বছর ধরেই শাহবাগ এলাকায় অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে এই এলাকায় ৮১টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এর মধ্যে পরিচয় পাওয়া যায় মাত্র ১৩ জনের। অর্থাৎ গত ২১ মাসে উদ্ধার হওয়া ১৬০টি মরদেহের মধ্যে ১৩৩ জনের পরিচয়ই অজানা থেকে গেছে।
শাহবাগ এলাকার এমন পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে রাজধানীর বড় একটি ভাসমান জনগোষ্ঠী। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, চাঁনখাঁরপুল, হাইকোর্ট মাজার, দোয়েল চত্বর এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন অনেক পরিচয়হীন মানুষ।
তাদের কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কেউ গৃহহীন, কেউ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন। জীবনের শেষ সময়েও অনেকের পাশে থাকে না কোনো স্বজন।
গত ৬ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পেছনের একটি জায়গায় প্রায় ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার ডান পায়ের গোড়ালিতে ব্যান্ডেজ ছিল। আশপাশে মানুষ চলাচল করলেও কেউ জানতেন না তিনি কে, কোথা থেকে এসেছেন বা তার পরিবারের কোনো খোঁজ আছে কি না।
এর আগের দিন একই এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল একজনের মরদেহ। তার পরিচয়ও পাওয়া যায়নি। একই দিনে কাছাকাছি স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একজনের মরদেহ। পুলিশের ধারণা, অসুস্থতার কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
শাহবাগ এলাকায় শুধু এক মাসেই অন্তত ১৫টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মানুষের অধিকাংশেরই শেষ পরিচয় হয়েছে বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে।
শাহবাগকে ভাসমান মানুষের আশ্রয়ের অন্যতম স্থান হিসেবে মনে করেন স্থানীয়রা। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় অনেক ভাসমান মানুষ এখানে নিরাপদ মনে করেন।
এ ছাড়া হাইকোর্ট মাজার ও দোয়েল চত্বরের আশপাশে নিয়মিত খাবার বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে খাবারের সন্ধানে অনেক মানুষ এসব এলাকায় অবস্থান নেন।
হাইকোর্ট এলাকার শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির মাজার থেকে প্রতিদিন দুপুর ও সন্ধ্যায় প্রায় ৫০০ মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এর একটি বড় অংশই গ্রহণ করেন ভবঘুরে ও ভাসমান মানুষ।
অনেকে আশপাশের খাবারের দোকান, হাসপাতাল এলাকার মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তায় দিন পার করেন। কিন্তু অসুস্থতা বা বার্ধক্য এলে তাদের অনেকেরই চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
পুলিশ ও চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদের বড় অংশের বয়স ৪০ বছরের বেশি। অনেকেই মাদকাসক্ত ছিলেন, আবার অনেকে দীর্ঘদিন বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।
চিকিৎসার অভাব, অপুষ্টি, রাস্তায় বসবাস এবং দীর্ঘদিন শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকের মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের মতে, অনেক রোগী গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই জটিল পরিস্থিতিতে চলে যান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন ও টক্সিকোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক হাজার ৬৯০টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২০২১ সালে ২৪৮টি, ২০২২ সালে ২৩০টি, ২০২৩ সালে ২৫০টি, ২০২৪ সালে ৩২৪টি, ২০২৫ সালে ৩৮৪টি এবং চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ২৫৪টি মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় পৌনে ছয় বছরে প্রতি বছর গড়ে ২৯২টি অজ্ঞাত মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে।
চিকিৎসকরা জানান, এসব মরদেহ থেকে দাঁত, হাড় ও অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়, যাতে ভবিষ্যতে স্বজনদের সন্ধান পাওয়া গেলে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
পুলিশ সাধারণত অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তের জন্য আঙুলের ছাপ সংগ্রহের চেষ্টা করে। এরপর অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে জাতীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
তবে অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। আবার মরদেহ পচে গেলে আঙুলের ছাপ বা অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিচয় না পাওয়া গেলে দেশের বিভিন্ন থানায় তথ্য পাঠানো হয় এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। তাতেও সাড়া না মিললে মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়।
অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলোর শেষ ঠিকানা হয় রাজধানীর রায়েরবাজার ও জুরাইন কবরস্থান। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম এসব মরদেহ দাফনের দায়িত্ব পালন করে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে ৪৬০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। ২০২৫ সালে দাফন করা হয়েছে ৬৪৪টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৩ সালে ৪৯০টি মরদেহ।
২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার বছরে রাজধানীতে মোট দুই হাজার ১৬৪টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, বছরে গড়ে প্রায় ৫৭৭টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মৃত্যুর পর পরিচয় শনাক্তের ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাজধানীতে কতজন গৃহহীন, ভবঘুরে বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ বসবাস করছেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রয়োজন।
সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মানুষের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে সরকারি তথ্যভান্ডার তৈরি করা গেলে মৃত্যুর পর তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে অসুস্থ বা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আগেই সহায়তার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
শাহবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করেন। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেই কিছু মানুষ বছরের পর বছর পরিচয়হীন জীবন কাটান। সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো, মৃত্যুর পরও অনেকের পরিচয় ফিরে আসে না। তাদের শেষ পরিচয় হয়ে যায় শুধু একটি সংখ্যা—একটি অজ্ঞাত মরদেহ।

