ভেজাল, নকল পণ্য বিক্রি, অতিরিক্ত দাম আদায় এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির মতো অনিয়ম ঠেকাতে দেশজুড়ে অভিযানে নেমেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এসব অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ৮২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে মোট ১২ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ঢাকা সহ দেশের ২৮টি জেলায় একযোগে এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ৪৩টি দল পাইকারি ও খুচরা বাজারে গিয়ে পণ্যের মান, মূল্য এবং সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল নকল ও ভেজাল পণ্য বন্ধ করা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা। একই সঙ্গে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের সিলিন্ডারসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় পরিচালিত বিশেষ অভিযানে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নকল প্যাকেট ব্যবহার করে কফি ও সস বাজারজাত করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল জব্বার মণ্ডল ও ইন্দ্রাণী রায়ের নেতৃত্বে ওই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সহযোগিতা করেন।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দোহা করপোরেট, মাসুম এন্টারপ্রাইজ এবং জুনায়েদ এন্টারপ্রাইজ—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫০ ধারায় ২ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ‘নাসক্যাফে কফি’, ‘আমেরিকান বারবিকিউ সস’ এবং ‘ইয়েলো মাস্টার্ড সস’-এর নকল প্যাকেট ব্যবহার করে পণ্য বাজারজাত করার অভিযোগ ছিল।
দেশব্যাপী পরিচালিত অভিযানে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত মূল্য তালিকা প্রদর্শন করছেন কি না, সঠিক ওজন ও পরিমাপ ব্যবহার করছেন কি না এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করছেন কি না—এসব বিষয়ও যাচাই করা হয়।
অভিযান চলাকালে ব্যবসায়ীদের দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্য তালিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি, সঠিক ওজন নিশ্চিত করা এবং ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় রসিদ বা ভাউচার দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
এ ছাড়া নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের ক্রয় ও বিক্রয় সংক্রান্ত রসিদ সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে তা যাচাই করা যায়।
ভোক্তাদের সচেতন করতে অভিযানের সময় বিভিন্ন প্রচারপত্র ও লিফলেট বিতরণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এসব কার্যক্রমে সহায়তা করেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভোক্তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য না কেনার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, অতিরিক্ত কেনাকাটা অনেক সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে।
পণ্য কেনার আগে মূল্য তালিকা, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ এবং পণ্যের ওজন যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে অধিদপ্তর। পাশাপাশি প্রতিটি কেনাকাটার ক্ষেত্রে বিক্রেতার কাছ থেকে রসিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।
কোনো ভোক্তা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে প্রতারণা, অতিরিক্ত মূল্য আদায় বা অন্য কোনো অনিয়মের শিকার হলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার অধিকার রক্ষায় এ ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে।

