দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার যখন সবচেয়ে জরুরি, ঠিক তখনই বায়ুদূষণ এই উদীয়মান খাতের বিকাশে এক মারাত্মক অদৃশ্য বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ধোঁয়া ও ধুলাবালির প্রভাবে সোলার প্যানেলের ওপর ধূলির আস্তরণ জমে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন প্রতি মুহূর্তে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় এই তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘বায়ু দূষণ রোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) এবং স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩৬টি নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, বাতাসে ভাসমান ভারী ধূলিকণার কারণে সৃষ্ট এই ‘সয়েলিং ইফেক্ট’ সৌর প্যানেলের কার্যক্ষমতা হু হু করে কমিয়ে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নোংরা বা ধুলো জমা প্যানেল থেকে যেখানে গড়ে ৩৮ থেকে ৪১ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেখানে তা নিয়মিত ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পরিষ্কার রাখলে উৎপাদন ৪৯ থেকে ৫৫ কিলোওয়াট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের সোলার ব্যবস্থার জন্য মাসে মাত্র ৪০ হাজার টাকা পরিচর্যা খরচ করলে অতিরিক্ত ৬ দশমিক ৬৭ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এতে প্রতি মাসে প্রায় ৫৬ হাজার ২৪ টাকার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করা সম্ভব। অর্থাৎ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাদ দিয়েও নিট ১৬ হাজার ২৪ টাকা এবং বছর শেষে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।
ডিআরইউ মিলনায়তনে উপস্থাপিত জরিপ অনুযায়ী, দেশের শতভাগ সোলার ব্যবহারকারীই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে ধুলাবালির কারণে প্যানেলের কর্মক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, প্রায় ৭৯ দশমিক ২ শতাংশ ব্যবহারকারী এখনো কোনো আধুনিক ও রোবোটিক প্রযুক্তির বদলে সনাতন ম্যানুয়াল বা হাতে ধরে পানি দিয়ে প্যানেল পরিষ্কার করছেন, যা ততটা কার্যকর নয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ২০২৬ সালের সর্বশেষ উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৫২২ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও তীব্র গ্যাস সংকট ও জ্বালানি আমদানির ঘাটতির কারণে দৈনন্দিন বাস্তব উৎপাদন মাত্র ১৪ হাজার থেকে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ফলে পিক-টাইমে প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ থেকে ১২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং বা বিদ্যুতের বিশাল ঘাটতি সামলাতে হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুতের মাত্র ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, যা বৈশ্বিক গড় ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কম। দেশের মোট ১ হাজার ৮৭১ দশমিক ৫৮ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সিংহভাগ; অর্থাৎ প্রায় ৭৭ দশমিক ৫১ শতাংশই আসে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। কিন্তু কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মতো অপরিশোধিত জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বাতাসে যে বিষাক্ত সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা কার্বন ছড়িয়ে পড়ছে, তা ঘুরেফিরে এই সোলার প্যানেলগুলোর ওপর জমা হয়ে উৎপাদন আরও কমিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে ঐতিহ্যবাহী জ্বালানির অভাবে আমরা পূর্ণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি না, অন্যদিকে সেই জ্বালানির দূষণে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সম্ভাবনাও নষ্ট হচ্ছে।
গবেষণালব্ধ তথ্য ও দেশের বিদ্যমান সংকট বিবেচনায় এনে বিশেষজ্ঞ দল নীতিনির্ধারকদের কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেছেন। প্রথমত, শিল্প খাতের জন্য ঘোষিত ৩ হাজার মেগাওয়াটের জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সোলার প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্পকারখানায় অনভিজ্ঞ ম্যানুয়াল ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ডেটা-ভিত্তিক ও রোবোটিক স্বয়ংক্রিয় ক্লিনিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা। এবং তৃতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় হয়ে শিল্পাঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ধূলিকণা ও ধোঁয়া নির্গমন কঠোরভাবে তদারকি করা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শরীফ নাফে এস-সাবেরসহ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকরা একমত হন যে, জলবায়ু পরিবর্তন ও বিদ্যুৎ সংকট থেকে বাঁচতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ সৌরবিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই।

