রাজধানীর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণের ঘটনার পর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফ্লাইওভার এবং প্রবেশ ও বহির্গমনপথে বসানো হয়েছে দুই শতাধিক চেকপোস্ট। সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশির পাশাপাশি মোটরসাইকেল চলাচলেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গোপন তৎপরতার তথ্যের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতাকর্মীরা কিছুটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য আছে। তাঁরা রাজনীতিতে সক্রিয় হতে গোপনে কাজ করছেন, এমন তথ্যে বাহিনীর সব বিভাগ তৎপর হয়েছে। গোয়েন্দা কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই প্রতিবেদনে নেই। অভিযোগগুলো সরকারি সূত্র ও বাহিনীর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে এসেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের নানা স্থানে সাম্প্রতিক হামলা ও সহিংসতার পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের তথ্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসেছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, সামনে জনজীবনে আরও বড় কোনো ঘটনা ঘটিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা হতে পারে। বিষয়টি সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। সূত্রটির মতে, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে যৌথ অভিযানের বিকল্প নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরও কঠোর অবস্থানের কথা বলেছে। তাদের ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর হওয়া ছাড়া উপায় নেই। অপরাধীদের কোনো ছাড় না দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যাঁরা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং যাঁরা ইন্ধন দিয়েছেন, সবার বিরুদ্ধেই তদন্ত চলছে। তদন্তে যাঁদের নাম আসছে, তাঁদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অপরাধীদের ধরতে পোশাকধারী পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। এসব অভিযান আরও জোরদার করা হবে। নতুন করে যেসব অপরাধী মাথাচাড়া দিয়েছে, তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে বলেও জানান তিনি।
ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ফ্লাইওভার ও প্রবেশপথে দুই শতাধিক চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এর বাইরে নিয়মিত চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রমও চলমান।
ডিএমপির পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নও (এসআরবি) রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনায় চেকপোস্ট ও টহল বাড়িয়েছে। এসআরবির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, রাজধানীজুড়ে তাঁদের ৪০টির বেশি চেকপোস্ট ও ২১টি টহল দল কাজ করছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা ও অভিযানিক দলও মাঠে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও নজরদারি চলছে।
প্রতিবেদনের তথ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বোঝা দরকার। ডিএমপির দেওয়া দুই শতাধিক চেকপোস্টের হিসাব আর এসআরবির ৪০টির বেশি চেকপোস্টের হিসাব আলাদা সংস্থার। দুটি সংখ্যা যোগ করা হয়েছে কি না, কিংবা এসআরবির চেকপোস্ট ডিএমপির সংখ্যার মধ্যেই ধরা আছে কি না, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি। তাই রাজধানীতে মোট চেকপোস্টের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনের মূল শিরোনামে অর্ধশত চেকপোস্টের কথা বলা হলেও ভেতরের তথ্যে এর চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যা উল্লেখ আছে।
এই পদক্ষেপের কয়েকটি দিক বিশ্লেষণযোগ্য। প্রথমত, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণের ঘটনা সরাসরি জনজীবনে আতঙ্ক তৈরি করে। তাই প্রবেশপথ ও ফ্লাইওভারে নজরদারি বাড়ানো নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়ত, মোটরসাইকেলে বাড়তি নজরদারির কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের হামলায় দ্রুত গতির এই বাহন ব্যবহার হয় বলে ধারণা করা হতে পারে, যদিও প্রতিবেদনে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি।
তৃতীয়ত, ব্যাপক চেকপোস্ট ও তল্লাশির ফলে সাধারণ নাগরিকদের দুর্ভোগের আশঙ্কাও থাকে। যানজট বাড়তে পারে। তল্লাশির নামে হয়রানি বা বৈষম্যের অভিযোগ উঠলে তা পুরো উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করবে। তাই তল্লাশির পদ্ধতি স্বচ্ছ ও আইনসম্মত রাখা জরুরি। এ বিষয়ে বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস বা নির্দেশনার কথা প্রতিবেদনে নেই।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির কথাও উঠে এসেছে। এ ধরনের নজরদারি অপরাধ প্রতিরোধে কাজে লাগলেও নাগরিক গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে আনে। কোন ধরনের পোস্ট বা কার্যক্রম নজরদারির আওতায় পড়বে, তা স্পষ্ট নয়।
আরেকটি বিষয় হলো, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের দাবি। ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদ’ ও ‘অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব’ কথাগুলো কাদের বোঝায়, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনটির সঙ্গে নিষিদ্ধ সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে এবং কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, সে তথ্যও নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করে বক্তব্য দিয়েছে। তাই এই অভিযোগ আদালতে বা তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দাবি হিসেবেই দেখা সংগত।
সব মিলিয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে। এখন নজর থাকবে, এই কড়াকড়ি সহিংস ঘটনা ঠেকাতে কতটা কার্যকর হয়, তদন্তে কারা শনাক্ত ও গ্রেপ্তার হন এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে এর প্রভাব কেমন পড়ে, সেদিকে।

