দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালুর প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী মাসে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রূপপুর কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। চুল্লির নিরাপত্তা ভালভ পরীক্ষার ফলাফল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেছে। এর ফলে কেন্দ্রটির কমিশনিং কার্যক্রম আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
এর আগে নিরাপত্তা ভালভ পরীক্ষায় কিছু ত্রুটি ধরা পড়ায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে উচ্চ চাপ প্রয়োগ করে দুই দফা পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার তা অনুমোদন করা হয়েছে।
পরবর্তী ধাপে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু করা হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে বলা হয় ‘প্রথম ক্রিটিক্যালিটি’। এই ধাপে চুল্লির ভেতরে নিয়ন্ত্রিতভাবে তাপ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এর পর চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং বিভিন্ন কারিগরি যাচাই করা হবে। ধীরে ধীরে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে টারবাইন চালু করা হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পরপরই পূর্ণ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে না। নির্ধারিত মান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে ধাপে ধাপে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় যাবে।
রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ফলে দুটি ইউনিট সম্পূর্ণ চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিদ্যুৎ দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে এটি দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি বিভাগের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, রূপপুর প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নয়, এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির একটি বড় সুযোগ। তার মতে, প্রথম ইউনিট এখন উৎপাদনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের মাধ্যমে এর কার্যক্রম আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট সময় পর পারমাণবিক জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
রূপপুর প্রকল্পের ধারণা স্বাধীনতার পর থেকেই আলোচনায় ছিল। দীর্ঘ পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পর রাশিয়ার সহায়তায় এটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মাধ্যমে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করে।
এখন প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপেক্ষা। রূপপুর চালু হলে এটি শুধু দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

