জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু হেনা মুহিবের এক বিশেষ অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান চাকরির বাজারের অত্যন্ত করুণ ও আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। দৈনিক সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ এবং বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক উপাত্ত উদ্ধৃত করে দেখানো হয়েছে যে, দেশে বর্তমানে শিক্ষার হার যত বাড়ছে, বেকারত্বের হারও ঠিক ততটাই বিপজ্জনক রূপ নিচ্ছে। প্রতি বছর দেশে প্রায় ২০ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত হলেও কাজের সুযোগ পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ৯ লাখ মানুষ। বাকি ১১ লাখ নবীন বেকার প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছেন পুরোনো বেকারদের মিছিলে, যার একটি বড় অংশই দেশের উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী।
দৈনিক সমকালের প্রতিবেদনে বিবিএসের ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করে জানানো হয়, দেশের মোট বেকারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা তরুণ-তরুণী। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা বেকারদের হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিক লেভেলের ক্ষেত্রে তা মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, যাদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম—মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ সাময়িকীর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত যুবকের মধ্যে ৩৬ জনই বর্তমানে বেকার। এর ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপরিকল্পিত ও দ্রুত ব্যবহার তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির আগেই চাকরির বাজারকে আরও সংকুচিত করে তুলছে।
বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পুলিশের শিল্প শাখার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছরে দেশে অন্তত ৪৫৭টি শিল্পকারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে ১৭০টিই তৈরি পোশাক খাতের। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, বন্ধ হওয়া ছোট-বড় কারখানার প্রকৃত সংখ্যা প্রায় এক হাজার এবং কেবল পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন অন্তত দেড় লাখ শ্রমিক। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অর্থাৎ ৪.৫ শতাংশে নেমে আসা, সরকারি বিনিয়োগের মন্দা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য এই সংকটকে বহুমুখী রূপ দিয়েছে। এর সরাসরি শিকার হয়েছেন নারী শ্রমিকরা; ২০২২ সালে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ যেখানে ৪২.৮ শতাংশ ছিল, ২০২৪ সালে তা কমে ৩৮.৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন জব পোর্টাল বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সমকাল জানায়, তাদের প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত জমা রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে দুই লাখ আবেদনের চাপ সামলাতে হয়। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সার্বিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার কারণে দেশে দারিদ্র্যের হারও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। দৈনিক তিন ডলারের কম ভোগব্যয় করা দরিদ্র মানুষের সংখ্যা গত অর্থবছরে ২১ লাখ বেড়েছে এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ২২.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, নীতি নির্ধারণে সমন্বয়হীনতা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের বাস্তবমুখী দক্ষ করে না তোলাই এই মেগা সংকটের মূল কারণ। তিনি পরামর্শ দেন যে, দ্রুত বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করা, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিশেষ নজর দেওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়ানো এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, আগামী দিনগুলোতে শিক্ষিত বেকারত্বের এই হার সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

