গত ২৫ বছরে বাংলাদেশ মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমানো, শিক্ষা বিস্তার এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও বাল্যবিবাহ এখনো বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে রয়ে গেছে। উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরও দেশে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বাল্যবিবাহ বন্ধে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩-৯৪ সালে ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিবাহের হার ছিল ৭৩ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশে। অর্থাৎ প্রায় তিন দশকে কমেছে মাত্র ২২ শতাংশীয় পয়েন্ট।
শিক্ষা ও আর্থিক সক্ষমতা সাধারণত বাল্যবিবাহ কমানোর অন্যতম প্রধান উপাদান হলেও বাংলাদেশে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত। ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা নারীদের মধ্যেও ২৫ শতাংশের বিবাহ ১৮ বছরের আগে হয়েছে। এমনকি সবচেয়ে ধনী পরিবারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মেয়েরও বিবাহ হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই।
আঞ্চলিক চিত্রে দেখা যায়, বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে। ২০২৪ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের ৭০টি উপজেলার মধ্যে ৬৯টিতেই বাল্যবিবাহের হার ৬০ শতাংশের বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় এই হার দেশের সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে সিলেট বিভাগে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিভাগের সব উপজেলায় বাল্যবিবাহের হার ৪৩ শতাংশের নিচে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় দেশের সর্বনিম্ন হার ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের কাছে সিলেটের পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ প্রচলিত সূচক অনুযায়ী সিলেটে বাল্যবিবাহের হার বেশি হওয়ার কথা ছিল। এই অঞ্চলে মাধ্যমিকের পর শিক্ষা গ্রহণকারী নারীর হার কম, নারী কর্মসংস্থানও জাতীয় গড়ের তুলনায় কম। তবুও এখানে বাল্যবিবাহ তুলনামূলক কম।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, সিলেটের ক্ষেত্রে অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক পুরুষ বিদেশে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিবাহ করেন, ফলে বিয়ের বয়স তুলনামূলক বেশি হয়। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সিলেটে অবিবাহিত মানুষের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি।
অন্যদিকে রাজশাহী ও খুলনায় নারীদের বিবাহের বয়স কম এবং অনেক নারী মনে করেন তারা আরও পরে বিবাহ করতে পারতেন। বিডিএইচএস ২০২২ অনুযায়ী, রাজশাহীতে ৪৭ শতাংশ এবং খুলনায় ৪২ শতাংশ নারী জানিয়েছেন তারা আরও দেরিতে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দারিদ্র্য, নারীর কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ। স্থানীয়দের মতে, অনেক পরিবার মেয়েদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কম বয়সেই বিবাহ দিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাল্যবিবাহ শুধু শৈশব কেড়ে নেয় না, এটি মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই শুধু আইন প্রয়োগ নয়, মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

