নিজ নিজ এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ঐক্য বজায় রাখতে সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে কোনো বিতর্কিত কাজে না জড়াতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সতর্ক থাকতেও তিনি দলীয় এমপিদের বলেছেন। রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় তিনি এসব নির্দেশনা দেন।
সভাটি শুরু হয় সন্ধ্যা ছয়টা ২০ মিনিটে। সভাপতিত্ব করেন সংসদ নেতা ও সংসদীয় দলের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নিজেই। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের তারিখ ঘোষণার আগেই হঠাৎ এই সভা ডাকায় রাজনৈতিক অঙ্গন এবং দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। সভা শেষে আলোচনার বিষয়বস্তু সামনে আসায় সেই কৌতূহলের অনেকটাই মিটেছে।
সভায় অংশ নেওয়া একাধিক সংসদ সদস্যের বরাতে জানা গেছে, চলতি ত্রয়োদশ সংসদের পরবর্তী অধিবেশন আগামী ৮ নভেম্বর শুরু হতে পারে। অধিবেশনের আগে আবার সংসদীয় দলের সভা ডাকা হবে। সভায় আলোচনায় উঠে আসে দলের ভেতরের শৃঙ্খলা, সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন দুর্গাপূজা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সংবিধান সংশোধন এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। বক্তব্য দেওয়া এমপিদের কেউ কেউ নিজেদের নানা অসুবিধা ও সীমাবদ্ধতার কথাও দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধানের সামনে তুলে ধরেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রসঙ্গটি সভায় বাড়তি গুরুত্ব পায়। নির্বাচন কমিশন আজ সোমবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এ জন্য কমিশন আজ বৈঠকও ডেকেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী এমপিদের বলেছেন, নির্বাচনে যেন কোনোভাবেই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ না হয়। প্রতিটি এলাকায় দলের ঐক্য অটুট রাখতে হবে। তিনি আরও সতর্ক করেন, বিরোধী পক্ষ যেন এই নির্বাচনকে ঘিরে পরিবেশ নষ্ট করতে বা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে।
আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো মূল্যে দেশের প্রতিটি এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। তাঁর ভাষ্য, কোনো গোপন বা পলাতক শক্তি যেন আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আসন্ন দুর্গাপূজা ঘিরে কোনো মহল যাতে অপরাধ করতে না পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদেরও সজাগ থাকতে বলেছেন তিনি।
সভা শেষে ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপি দলীয় এমপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান, সভায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে দলকে সুসংগঠিত করা এবং ঐক্য ধরে রাখা নিয়ে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী দলীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাতেও সমান গুরুত্ব দিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী এ-ও বলেছেন, ঐক্য ধরে রেখে দলকে শক্তিশালী রাখা গেলে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হবে না। পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে সব সংসদ সদস্যকে সোচ্চার ভূমিকা রাখার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
সভার আলোচ্যসূচি বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, সরকারি দল আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাধারণত তৃণমূলে দলীয় শক্তির পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নির্বাচনে মনোনয়ন, প্রার্থী বাছাই ও স্থানীয় প্রভাব নিয়ে দলের ভেতরে মতবিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার ঠিক আগের দিন এমপিদের একসঙ্গে বসিয়ে ঐক্য ও শৃঙ্খলার বার্তা দেওয়াকে অনেকেই আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্গাপূজার প্রসঙ্গও সময়োপযোগী। পূজার ছুটির আগে ও পরে সারা দেশে উৎসবের আমেজ থাকে। এ সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও উৎসবের শান্তিপূর্ণ আয়োজন নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এমপিদের এই দায়িত্বে যুক্ত করায় স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের ভূমিকা আরও গুরুত্ব পাবে।
বিতর্ক এড়ানোর নির্দেশনাও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সরকারি দলের কোনো এমপি বা নেতার বিতর্কিত আচরণ সরকারের ভাবমূর্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই দলীয় সংসদ সদস্যদের সংযত থাকার বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সামনে সংসদের অধিবেশন, সংবিধান সংশোধনের আলোচনা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন, এই তিনটি বড় কাজ অপেক্ষা করছে সরকারি দলের জন্য। এসব সামলাতে দলের ভেতরের ঐক্য ও শৃঙ্খলা কতটা ধরে রাখা যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

