দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে বর্তমানে ৩০৩ জন শিশু রয়েছে। এসব শিশুর কল্যাণ ও পুনর্বাসনের জন্য তাদের পছন্দের নিকটাত্মীয়ের কাছে অথবা সরকারি শিশু পরিবারে রাখার সুপারিশ করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। সম্প্রতি হাইকোর্টে দাখিল করা এক প্রতিবেদনে অধিদপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির মাধ্যমে কারাগারে থাকা শিশুদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হয়। তাদের জন্য খেলনা, পোশাক ও শিশুখাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়। তবু শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করতে কারাগারের বাইরে বিকল্প পরিবেশে রাখাকেই সমাজসেবা অধিদপ্তর শ্রেয় মনে করছে।
এ বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা রিটটি দায়ের করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের বেঞ্চ আদেশ ও রুল জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, কারাগারে থাকা শিশুদের নিরাপত্তা, কল্যাণ, শিক্ষা, সুষ্ঠু বিকাশ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না। অবকাশকালীন ছুটির পর রিটের চূড়ান্ত শুনানির কথা রয়েছে।
আদালত এর আগে গত ১৫ জুন কারা কর্তৃপক্ষের কাছে বন্দি মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের সংখ্যা ও বয়সের বিবরণ চেয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারা কর্তৃপক্ষ সেই প্রতিবেদন দাখিল করেনি। ফলে আদালতের সামনে এই মুহূর্তে মূলত সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যই রয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে ছিল ২৯৯ জন শিশু। এদের মধ্যে ১৫৩ জন কন্যাশিশু এবং ১৪৬ জন ছেলেশিশু। শিশুদের মায়েদের অধিকাংশই মাদক মামলার আসামি। কেউ সাজা ভোগ করছেন, আবার কারও মামলা বিচারাধীন।
বিভাগওয়ারি চিত্রে সবচেয়ে বেশি শিশু ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগের ১৮টি কারাগারে রয়েছে ১০০ শিশু। চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে ৯০ জন, রাজশাহী বিভাগের আটটি কারাগারে ২৫ জন এবং রংপুর বিভাগের আটটি কারাগারে ২৫ জন শিশু আছে। সিলেট বিভাগের পাঁচটি কারাগারে ১৯ জন, খুলনা বিভাগের ১০টি কারাগারে ২০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি কারাগারে ১৩ জন এবং বরিশাল বিভাগের ছয়টি কারাগারে চারজন শিশু রয়েছে। কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি শিশু রয়েছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে।
এই তথ্যের মধ্যে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। কারা অধিদপ্তরের এপ্রিলের হিসাবে শিশু ছিল ২৯৯ জন, আর সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সংখ্যা ৩০৩। দুই হিসাবের সময় আলাদা, তাই এই সামান্য ব্যবধান অস্বাভাবিক নয়। তবে আদালত যে সুনির্দিষ্ট ও হালনাগাদ তথ্য চেয়েছিল, তা কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে না আসায় বয়সভিত্তিক চিত্র এখনো অস্পষ্ট।
শিশুদের কারাগারে মায়ের সঙ্গে রাখার বিষয়টি জটিল। একদিকে মায়ের সান্নিধ্য শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ছোট বয়সে। অন্যদিকে কারাগারের পরিবেশ শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা ও সামাজিক বিকাশের জন্য উপযোগী নয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সুপারিশ এই দ্বিধার মধ্যেই শিশুর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা। তবে কোন বয়সের শিশুকে মা থেকে আলাদা করা হবে, কীভাবে নিকটাত্মীয় বাছাই হবে এবং সরকারি শিশু পরিবারগুলো কতটা প্রস্তুত, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
রুলের চূড়ান্ত শুনানিতে আদালতের নির্দেশনা কী আসে এবং কারা কর্তৃপক্ষ কবে প্রতিবেদন জমা দেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

