অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের মতো মারাত্মক বৈশ্বিক অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করার পাশাপাশি ইউরোপের মূলধারার উন্নত অর্থনৈতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের পরিধি বাড়াতে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আজ সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠকে সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং ইইউ প্রতিনিধিদলের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন বিষয়ক প্রভাবশালী কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জনশক্তি রপ্তানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ইতোমধ্যে ৪৯টি অনিয়মকারী রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের তথ্য তুলে ধরে ইউরোপীয় ব্লকে বাংলাদেশের জন্য আইনি ও নিরাপদ উপায়ে কাজের সুযোগ উন্মুক্ত করার জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বৈঠকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার বৈধ উপায়ে জনশক্তি পাঠাতে এবং মানবপাচারের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট ধ্বংস করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দীর্ঘদিনের অনিয়ম, প্রলোভন ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে শক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে ইতোমধ্যে দেশের ৪৯টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং পুরো রিক্রুটমেন্ট খাতকে একটি স্বচ্ছ কাঠামোর অধীনে আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ ‘ট্যালেন্ট পার্টনার’ হিসেবে বিবেচনা করে যাতে সহজে আইনি চ্যানেলে বাংলাদেশের যোগ্য কর্মীরা ইইউভুক্ত দেশগুলোতে প্রবেশ করতে পারে।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মুক্তার আহমেদ ‘বাংলাদেশ-ইইউ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’-এর অধীনে কয়েকটি নির্দিষ্ট সম্ভাবনাময় খাতের কথা উল্লেখ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে সরাসরি সহযোগিতার আবেদন জানান। তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), মেকানিক্যাল ও সিভিল কনস্ট্রাকশন, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প, জাহাজ নির্মাণ শিল্প (শিপবিল্ডিং), আধুনিক কৃষি এবং হসপিটালিটি ও পর্যটন খাতের মতো কারিগরি সেক্টরগুলোতে বাংলাদেশি যুবকদের জন্য আইনি চাকরির পথ সুগম করার প্রস্তাব দেন। এছাড়া ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেট প্রদান, ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম চালুর পাশাপাশি ‘জাতীয় পুনর্বাসন নীতি ২০২৫’-এর আওতায় ফেরত আসা প্রবাসীদের পুনর্দখল ও পুনর্বাসনে কারিগরি সহায়তার অনুরোধ জানানো হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন বিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার বৈশ্বিক অভিবাসন নীতি সামাল দিতে বাংলাদেশের ইতিবাচক মনোভাবের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের রুটগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি আইনি পথে দক্ষ শ্রমশক্তি নিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ব্রুনার জানান যে বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রে প্রায় ৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক অত্যন্ত সুনামের সাথে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম আবেদনের প্রবণতা অনেক কমে এসেছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে বৈশ্বিক অভিবাসন সূচকে বাংলাদেশকে একটি ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক, অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলাম, বোয়েসেল -এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক এবং ইইউর পক্ষ থেকে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ উভয়পক্ষের নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত ছিলেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ জীবন ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে মানবপাচারকারীদের শিকার হয় এবং বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে আইসিটি, শিপবিল্ডিং ও নির্মাণ খাতের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইনি ভিসা নিশ্চিত করা যায়, তবে তা কেবল অবৈধ অভিবাসনই কমাবে না, বরং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে অভাবনীয় গতি নিয়ে আসবে।

