ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানের নিজের ছেলে, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনার স্ত্রীকে সারের নতুন ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গত শুক্রবার প্রকাশিত এই তালিকাকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। দলীয় ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় বিএনপির একাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
বিএনপির সূত্রগুলো আরও জানায়, এমপির ভাগিনা শরীফুল ইসলাম আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গোয়ালনগর থেকে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। সেই লক্ষ্যেই স্ত্রী নুরুন্নাহারের নামে ডিলারশিপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। নুরুন্নাহারের শ্বশুর সাদেক মিয়া চাতলপাড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক।

তালিকা প্রকাশের পর থেকেই ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সারের ডিলারে আওয়ামী লীগের দোসর!!! এমন হলে আওয়াজ তুলুন, দরকার হলে ঐ আকামে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নিয়ে লিখুন।’
অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য এম এ হান্নান। তিনি বলেন, ‘সরকারের আইনকানুন ও নিয়ম মেনেই আমার ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী সার ডিলারের নিয়োগ পেয়েছে। আর তাদের জায়গাগুলোতে (তিন ইউনিয়নে) যোগ্য তেমন কেউ আবেদন করেননি। মানুষ তো কথা বলবেই। এসব সত্য না।’
টাকার বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের বাংলাদেশের মানুষের সমস্যা। এটা সম্পূর্ণ গুজব। কোনোটাই সত্য নয়।’
নিয়োগ পাওয়া বাকি ডিলারদের মধ্যেও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুড়িশ্বরের জসিম মিয়া আগে নিষিদ্ধ যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক ওরফে দানার মিয়ার ভাগিনা। কুন্ডার রেনু মিয়া স্থানীয় যুবদল সভাপতি অনু মিয়ার ভাই; অনু মিয়ার পূর্ববর্তী ডিলারশিপ বাতিল হওয়ার পর এবার তার ভাই নিয়োগ পেয়েছেন। ফান্দাউকের শারমীন আক্তার ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি ফয়েজ আনসারির স্ত্রী, তবে স্বামী-স্ত্রীর কেউই সারের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। চাতলপাড়ের শামীমা আক্তারের স্বামী আলমগীর হোসেন ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের পক্ষে কাজ করার কারণে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। হরিপুরের আরিফুল ইসলাম ঢাকায় ফার্নিচারের ব্যবসা করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী, সারের ডিলার নিয়োগ পেতে আবেদনকারীকে কমপক্ষে ২৫ টন ধারণক্ষমতার গুদাম দেখাতে হয়, যার দৈর্ঘ্য ২০ ফুট, প্রস্থ ১৫ ফুট ও উচ্চতা ১০ ফুট হতে হবে। তবে নাসিরনগরে নতুন নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের অনেকেই এই মানদণ্ড পূরণ করেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দলের ত্যাগী কেউই এই তালিকায় স্থান পাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের দুই নেতা ও বিএনপির দুই নেতা জানিয়েছেন, অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ বরাদ্দের বিষয়টি তারা শুনেছেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন বলেন, ‘যারা আবেদন করেছিলেন যাচাই-বাছাই করে তাদের নামের তালিকা জেলায় পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে কীভাবে কী হয়েছে জানি না।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা এমরান বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। সংসদ সদস্যরা প্রতিটি কমিটির উপদেষ্টা। এর বাইরে আমার কিছু বলার নেই।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও ৫টি পৌরসভায় সারের ১০৬টি ডিলারশিপের বিপরীতে মোট ৮২৫ জন আবেদন করেছিলেন। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে তিনজন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠায়। সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে ২৯২ জনের আবেদন সুপারিশ করা হয়।
সূত্র: ইত্তেফাক


