ইয়েমেনের হুথিদের একের পর এক হামলায় সৌদি আরবের বিমান চলাচল ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত দুই দিনে রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামের বিমানবন্দরে প্রায় দেড় হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। ঢাকা থেকে সৌদির তিন গন্তব্যে অন্তত ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় পাঁচ হাজারের বেশি যাত্রী দেশেই আটকা পড়েছেন। এঁদের বড় অংশই প্রবাসী কর্মী, যাঁরা কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন।
সৌদি আরবের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ (জিএসিএ) গতকাল জানিয়েছে, বিমানবন্দরের স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কার্যক্রম পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ বন্ধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, কবে খুলবে তার নির্দিষ্ট তারিখ বলা হয়নি।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার রিয়াদে ৬৫৫টি, জেদ্দায় ১৫৮টি ও দাম্মামে ৫৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়। সৌদি সময় সোমবার সকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বাতিল হয় রিয়াদে ৪৩৬টি, জেদ্দায় ১১৫টি ও দাম্মামে ৬৩টি। দুই দিনে বিমানবন্দরভিত্তিক হিসাবে মোট বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮৫। সংযোগকারী ফ্লাইটের কারণে এই হিসাবে কিছু পুনরাবৃত্তি থাকতে পারে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও ফ্লাইট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের জানান, শনিবার থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দাগামী বিভিন্ন এয়ারলাইনস মোট ৫১টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। এর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ১২টি। বাতিল ফ্লাইটগুলোর ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী বাংলাদেশে আটকা পড়েছেন। নতুন করে ফ্লাইট বাতিল হলে তা জানানো হবে বলেও তিনি জানান।
বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলার দুটি এবং রিয়াদ এয়ার ও সৌদিয়ার তিনটি করে ফ্লাইট রয়েছে। বাকি ৩৯টি সংযোগকারী ফ্লাইট। এর মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, এমিরেটসের নয়টি, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচটি, ফ্লাইদুবাইয়ের পাঁচটি, সালামএয়ারের তিনটি এবং ইজিপ্টএয়ারের একটি।
এয়ারলাইনগুলো পরবর্তী পদক্ষেপও জানিয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সংস্থাটির সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। নতুন সময়সূচি যথাসময়ে জানানো হবে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা পথে সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম জানান, যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফ্লাইট চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গতকাল ঢাকা থেকে দাম্মামগামী বিজি-৩৪৯ ফ্লাইটও স্থগিত করেছে বিমান। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ফ্লাইটের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও সময়সূচি আজ দুপুর ১২টার দিকে জানানো হবে। এর আগে রোববার দাম্মাম বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একই ফ্লাইট কাতারের দোহায় নামে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর বিমানবন্দর চালু হলে ফ্লাইটটি নিরাপদে দাম্মামে পৌঁছায়।
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলোর মধ্যেও সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিতের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। লুফথানসা গ্রুপ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ইতিহাদ এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ফ্লাইদুবাইও সৌদির বিভিন্ন গন্তব্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল করেছে। এ ছাড়া মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) সামরিক তৎপরতা ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বিবেচনায় সৌদির আকাশসীমা ব্যবহারে মার্কিন এয়ারলাইনসগুলোকে সতর্ক করেছে।
সোমবার নির্ধারিত সময়ে সৌদির উদ্দেশে যাত্রা করতে এসে অনেকে বিমানবন্দরে জানতে পারেন, তাঁদের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কেউ কেউ এসেছেন দূরবর্তী জেলা থেকে। অনেকে কর্মস্থলে যোগ দিতে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই ফেরার টিকিট কেটে রেখেছিলেন। শেষ মুহূর্তের এই বাতিলে তাঁরা কাজে সময়মতো যোগ দিতে না পারার দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ঢাকায় আত্মীয়স্বজন নেই, এমন যাত্রীদের অনির্দিষ্টকাল ঢাকায় থাকার ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে।
নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে গতকাল সকালে বিমানবন্দরে আসেন সোহাগ ইসলাম। দাম্মামগামী বিমানের ফ্লাইটে তাঁর দুপুর ২টা ১০ মিনিটে যাত্রার কথা ছিল। ছয় বছর ধরে সৌদিতে কাজ করা সোহাগ রিয়াদে টাইলস মিস্ত্রি হিসেবে কর্মরত। তিন মাসের ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন। ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে তিনি কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চাকরি হারানোর আশঙ্কাও তাঁর মনে কাজ করছে।
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন রিয়াদে একটি দোকানে কর্মরত লিয়াকত হোসেন। দুপুরের ফ্লাইট ধরতে সকাল থেকেই বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে বিকল্প ফ্লাইটে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত শাহজালাল বিমানবন্দরে সৌদিগামী আরও অনেক যাত্রীকে ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
এই সংকট শুধু বিমান চলাচলের সমস্যা নয়, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও গভীর। সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক সেখানে কর্মরত। ফ্লাইট স্থগিতের মেয়াদ ১৭ ও ২১ অক্টোবর পর্যন্ত গড়ানোয় আটকে পড়া যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ছুটি শেষে সময়মতো কাজে যোগ দিতে না পারলে শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে তাঁদের পরিবার এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহও চাপে পড়তে পারে।
আরেকটি উদ্বেগের দিক হলো, ঢাকা থেকে বাতিল ফ্লাইটের তালিকায় সরাসরি ফ্লাইট কম, সংযোগকারী ফ্লাইট বেশি। অর্থাৎ আমিরাত, কাতার ও ভারতের মতো তৃতীয় দেশ হয়ে সৌদি যাওয়ার বিকল্প পথও সংকুচিত হয়েছে। ফলে যাত্রীদের হাতে বিকল্প ফ্লাইটের সুযোগ সীমিত।
তবে পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। রিয়াদ বিমানবন্দর কবে চালু হবে, তার সময়সীমা জানানো হয়নি। যেসব শ্রমিকের টিকিট বাতিল হয়েছে, তাঁরা অর্থ ফেরত পাবেন, নাকি বিনা খরচে তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ পাবেন, সে বিষয়েও সংবাদে স্পষ্ট তথ্য নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিমান সংস্থাগুলো এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকে নজর থাকবে। আটকে পড়া কর্মীদের নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজনে দূতাবাসের সহায়তা নেওয়া এ সময়ে সহায়ক হতে পারে।

