বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে যশোরে সরকারি অর্থে বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হয়েছিল, লাগানো হয়েছিল তালগাছের চারা। কিন্তু সেসব উদ্যোগ এখন কার্যত অকার্যকর। কোথাও দণ্ডের অবস্থানই নিশ্চিত করতে পারছেন না স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা, কোথাও রোপণ করা তালগাছের একটিও বেঁচে নেই। এর মধ্যেই গত এক বছরে জেলায় বজ্রপাতে প্রাণ গেছে ৫১ জনের। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের দিনে এই চিত্র প্রশ্ন তুলছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কেন মানুষ নিরাপদ হচ্ছে না।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে যশোরে বজ্রপাতে নিহত ৫১ জনের মধ্যে ২৮ জনই কৃষক। বাকিদের মধ্যে আছেন গৃহিণী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও চাকরিজীবী। একই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। হতাহতদের বেশির ভাগই গ্রামের বাসিন্দা। মাঠে কাজ করার সময় খোলা জায়গায় থাকতে হয় বলে কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন, এই পরিসংখ্যান তারই প্রতিফলন।
বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত কেশবপুর ও ঝিকরগাছায় ২০২২ সালে তিনটি বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টার) বসানো হয়। কেশবপুরের মজিদপুর ইউনিয়নের দেউলি গ্রামের বালিয়ার বিলে একটি এবং ঝিকরগাছার মাগুরা ও গদখালীতে দুটি। এতে খরচ হয় ২২ লাখ টাকার বেশি। তবে স্থাপনের পর নিয়মিত তদারকি হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বালিয়ার বিলের দণ্ডটির নিচের কয়েকটি ঢাকনা চুরি হয়ে গেছে। সেখানে পৌঁছাতে বুকসমান পানি পার হতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, দণ্ড বসানোর পর প্রথম দুই বছর এলাকায় বজ্রপাত কম দেখা গেলেও এখন আবার আগের মতোই হচ্ছে। কিছুদিন আগেও সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ যে এলাকায় দণ্ডটি বসানো হয়েছিল, সেখানেই আবার প্রাণহানি ঘটছে।
তালগাছ রোপণের উদ্যোগের চিত্রও হতাশাজনক। ২০১৮ ও ২০২২ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঁচ হাজার তালগাছের চারা রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু পরিচর্যার অভাবে অধিকাংশই টেকেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কেশবপুরের বালিয়ার বিলের সড়কের পাশে ২০২২ সালে লাগানো ৫০টির বেশি চারার একটিও বেঁচে নেই বলে জানান স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী। কপোতাক্ষ নদের পাড়ে চারা রোপণের তথ্য থাকলেও সেগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে স্বচ্ছ তথ্যও মিলছে না। কেশবপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ জানান, ৫ আগস্টের অগ্নিকাণ্ডে তাঁর কার্যালয়ের নথিপত্র পুড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয়ের তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আবদুল কাদের জানান, জেলায় তিনটি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হলেও সেগুলোর বর্তমান অবস্থা তিনি জানেন না। তালগাছের চারাও টেকেনি। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয়দের অবহেলা ও গবাদিপশুর খেয়ে ফেলার কারণে এমন হয়েছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে প্রচার ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ও কর্মকর্তার ব্যাখ্যার মধ্যে ফারাক স্পষ্ট। একদিকে নিয়মিত তদারকি না হওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে দায় চাপানো হচ্ছে স্থানীয়দের ওপর। যে দপ্তর প্রকল্পের দায়িত্বে ছিল, তারাই এখন দণ্ডের অবস্থা জানে না, এটি জবাবদিহির ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা থাকলেও তার সুফল সবাই পাচ্ছে না। সরকারি নথি অনুযায়ী, বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির পরিবার সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা এবং আহত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অনুদান পেতে পারেন। কিন্তু মণিরামপুরের ডুমুরির বিলে কাজ করার সময় বজ্রপাতে নিহত হাফিজুর রহমানের স্ত্রী তহমিনা জানান, তাঁরা এই সহায়তার কথা জানতেন না, ফলে আবেদনও করেননি। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রচারের অভাব ও আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক পরিবার অনুদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে যশোরের চিত্র দেখাচ্ছে, উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির ব্যবস্থা ছিল না। ২২ লাখ টাকার বেশি খরচে বসানো দণ্ড ও পাঁচ হাজার চারার প্রকল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের নিরাপত্তায় তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ অবস্থায় সচেতনতা বাড়ানো জরুরি হলেও শুধু প্রচারে ঝুঁকি কমবে না। বিদ্যমান দণ্ডগুলো মেরামত ও নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা, তালগাছ রোপণে পরিচর্যার দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা এবং অনুদানের আবেদনপ্রক্রিয়া গ্রামীণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার। না হলে প্রতিবছর কৃষক ও গ্রামের মানুষকেই এই ঝুঁকির মূল্য দিতে হবে।

