দেশের জাতীয় সম্পদ ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য জাতীয় মাছ ইলিশের সার্বিক উৎপাদন গত দুই অর্থবছর ধরে টানা হ্রাস পাওয়ায় গভীর উদ্বেগে পড়েছেন গবেষক ও নীতি-নির্ধারকেরা। সরকারের পক্ষ থেকে প্রজনন মৌসুম নিশ্চিত করতে গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ২২ দিনের কঠোর মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন মেগা প্রকল্প এবং ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মতো স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের মৎস্য উৎপাদন ও উপকূলীয় অর্থনীতি রক্ষা করতে হলে জাটকা নিধন বন্ধ, ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং নদীর নাব্যতা ও রূপবিদ্যা ফিরিয়ে আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য প্রযুক্তি বিভাগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের মোট উৎপাদন ছিল ৫.২৯ লাখ টন, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২০,৬৮০ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই উৎপাদন কমে ৫ লাখ টনে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৫.৫ শতাংশ সরাসরি পতন নির্দেশ করে। অথচ ২০১৬ সালের ৩.৯৬ লাখ টন থেকে বিগত বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে ৫.৫ থেকে ৬ লাখ টনে উন্নীত হওয়ার স্বাভাবিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ শিকার এবং মার্চ-এপ্রিলের অভয়াশ্রমে অবাধে জাটকা নিধনের কারণেই এই কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক ধারা থমকে গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ সমাপ্ত হওয়ার পর এবার ‘টেকসই ইলিশ রক্ষায় মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ’ শিরোনামে নতুন প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ভিজিএফ চাল পাওয়ার উপযোগী জেলের সংখ্যা ৬.২০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৬.৪৬ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গবেষকরা কেবল পুরোনো ম্যানুয়াল টহলের বদলে স্যাটেলাইট, জিআইএস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাইড্রোঅ্যাকোস্টিক ডাটা এবং ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালিয়ে ‘স্মার্ট ইলিশ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে ৪০ মিটারের কম গভীরতায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারের অবৈধ প্রবেশ রুখতে কঠোর শূন্য সহনশীলতা বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকেরা।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় উঠে এসেছে আরেক আশঙ্কাজনক তথ্য; পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় দূষণের কারণে ইলিশের প্রধান প্রাকৃতিক খাদ্য ‘প্লাঙ্কটন’-এর পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে ৬৮ শতাংশ কমে গেছে, যা ইলিশের শারীরিক বৃদ্ধি ও আকারের ওপর সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এছাড়া বিষখালী ও উপকূলীয় নদীতে ‘চাপিলা’ বানিয়ে বেহুন্দি ও মশারি জালে রেণু পোনাসহ পোনা মাছ ধ্বংস করার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও পলি জমার কারণে বাংলাদেশের নদীতে ইলিশ আগমন কমলেও ভারতের গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনা ও ভারুচ এলাকায় ইলিশের উৎপাদন আশাতীতভাবে বেড়েছে। নর্মদা নদীর মোহনার লবণাক্ততার সঠিক অনুপাত ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহকে এই প্রজনন সাফল্যের মূল অনুঘটক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক মৎস্য বিজ্ঞানীরা।
জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশের ওপর দেশের ৬ লাখ জেলের প্রত্যক্ষ জীবিকা এবং প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষের পরোক্ষ পরিবহন, প্রসেসিং ও ট্রেডিং ব্যবসা নির্ভরশীল। তাই মৎস্য অধিদপ্তরের ২০০৫ সালে নির্ধারিত পাঁচটি অভয়াশ্রমের ভৌগোলিক সীমানা পুনঃনির্ধারণ এবং প্রজনন নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনের সময়সীমা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে কিছুটা পরিবর্তন করা যায় কি না; তা নিয়ে অধিকতর গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বিজ্ঞানীরা। সরকারের সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা, কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং পরিবেশ দূষণ রোধের মধ্য দিয়েই কেবল বাংলাদেশ বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে তার শীর্ষে থাকা অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

