ইরান-সমর্থিত হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় উৎস, আবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিরও বড় একটি উৎস। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের ধাক্কায় আগে থেকেই চাপে থাকা অর্থনীতির জন্য এই সংঘাত তাই বাড়তি দুশ্চিন্তা হয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তাঁরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৯৫ কোটি ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। গত অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে এসেছিল প্রায় ৫৮৫ কোটি ডলার, যা মোট প্রবাহের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মাধ্যমে দেশটি বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বৃহত্তম উৎস হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে।
দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় সৌদি আরব ছিল বাংলাদেশের বিপুল অদক্ষ শ্রমশক্তির জন্য আশার জায়গা। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল দেশটিকে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে ব্যবসা ও পর্যটনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে রূপ দেওয়া। সেই পরিকল্পনার কারণে শ্রমবাজার আরও প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য। শুধু সেপ্টেম্বরেই দেশটি ৩২ হাজার ৯১৫ জন কর্মীর ছাড়পত্র দিয়েছে। কিন্তু হুথিদের হামলা এখন সেই অর্থনৈতিক রূপান্তরের উদ্যোগকেই পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১৭ অক্টোবর গ্রিনিচ মান সময় রাত ৯টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিত সক্ষমতায় চলছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে, সৌদি বিমানবন্দরের নিষেধাজ্ঞায় ৬১টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি সরাসরি ও ৩৯টি সংযোগকারী ফ্লাইট। এতে অন্তত ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী প্রভাবিত হয়েছেন। গতকাল ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদিগামী হাজারো যাত্রী ফ্লাইট বাতিলের খবর না জেনেই জড়ো হন।
যেসব কর্মীর কাজে যোগদানের কড়া সময়সীমা আছে, তাঁদের জন্য ফ্লাইট মিস করা বড় ঝুঁকি। এতে চাকরি হারানো, ভিসার মেয়াদ ফুরানো এবং নতুন করে ভ্রমণের ব্যয় বহনের আশঙ্কা তৈরি হয়। অনেক কর্মী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আপাতত রেমিট্যান্সে কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে তা পড়তে পারে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শমা ওবায়েদ ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে রেমিট্যান্সে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি গতকাল গণমাধ্যমকে জানান, সরকার নতুন বিদেশি শ্রমবাজার এবং ফেরত আসা কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, সৌদির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা দীর্ঘ হলে প্রবাসী শ্রমিক ও রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য খারাপ খবর হবে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত অভিবাসী শ্রমিকদের ফিরে আসতে বাধ্য হতে হতে পারে। তাঁর মতে, এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অঞ্চলটিতে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা।
শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন বাংলাদেশি নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন। ওই হামলায় মোট অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩শর বেশি মানুষ আহত হন। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। প্রথমে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল, এখন চারজন শঙ্কামুক্ত। শুধু উমরাহ ভিসায় যাওয়া সাফফাত রহমানের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। বাকি ১২ জন আহত শ্রমিককে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে দূতাবাসের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজা-ই-রাব্বির স্বাক্ষরিত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
দূতাবাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জরুরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ ও জনাকীর্ণ স্থান এড়িয়ে চলা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। দূতাবাস আরও সতর্ক করেছে, সংঘাত-সংক্রান্ত ছবি, ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহ, শেয়ার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ সৌদি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। প্রবাসীদের এ ধরনের উপকরণ মোবাইলে সংরক্ষণ বা আদান-প্রদান না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক দিক নিয়েও সতর্কবার্তা এসেছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির, যিনি বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতিও, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের অকারণে দূরে না ঠেলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, এই সংঘাত বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে কঠিন অবস্থানে ফেলেছে।
সব মিলিয়ে ঝুঁকির তিনটি স্তর স্পষ্ট। প্রথমত, তাৎক্ষণিক ভোগান্তি, যেখানে হাজারো যাত্রীর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মাঝারি মেয়াদের ঝুঁকি, যেখানে সংঘাত দীর্ঘ হলে নতুন কর্মী পাঠানো কমতে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ধাক্কা খেতে পারে। তৃতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি, কারণ আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ সৌদি আরব থেকে আসে। তবে সরবরাহে কোনো ব্যাঘাত ঘটেছে কি না, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
যুদ্ধ ও জ্বালানির বাড়তি দামে আগে থেকেই চাপে থাকা অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স ও জ্বালানি, দুই ক্ষেত্রেই ধাক্কা এলে সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তাই বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার উদ্যোগের পাশাপাশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করার বিষয়ে এখন থেকেই ভাবা দরকার বলে মনে হচ্ছে।

