নিমতলী ও চুড়িহাট্টার মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শত শত মানুষের প্রাণহানির পরও পুরান ঢাকার ঝুঁকি কমেনি। সর্বশেষ সোমবার (১২ অক্টোবর) চকবাজারের মনজুর খান প্লাজা মার্কেটের একটি দোকানে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ১০টি ইউনিটকে টানা ১২ ঘণ্টা লড়তে হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো বছরের পর বছর ফাইলবন্দি পড়ে আছে। ফলে ছোট আগুনও দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রায় ২৫ হাজার রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদামের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সোমবারের আগুনে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট কাজ শুরু করে। সময় গড়ানোর সঙ্গে আগুনের তীব্রতা বাড়লে ইউনিটের সংখ্যা বাড়িয়ে ১০টি করা হয়। শেষ পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সরু গলি ও ঘনবসতির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে বাধা পায়। ঘটনাস্থলে প্রচুর প্লাস্টিক ও দাহ্য পদার্থ মজুত থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সময় লাগে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, আগুনের ভয়াবহতার মূল কারণ ছিল জমিয়ে রাখা প্লাস্টিক ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ। ধোঁয়ার কারণে কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকতে পারেননি। সরু গলির কারণে গাড়ি ঢোকাই কঠিন ছিল, এর ওপর ছিল পানির তীব্র সংকট। তাঁর ভাষ্য, পুরো পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে ফায়ার সার্ভিসের বিস্তারিত সুপারিশমালা ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। সিটি করপোরেশন, রাজউক ও স্থানীয় বাসিন্দারা সহযোগিতা না করলে নিমতলী বা চুড়িহাট্টার মতো ট্র্যাজেডি বারবার দেখতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
২০১০ সালে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন এবং ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের প্রাণহানি ঘটে। দুটি ঘটনার পরই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ঘোষণা আসে, দ্রুত পুরান ঢাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ব্যবসা সরিয়ে নেওয়া হবে। বাস্তবে তা হয়নি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাসায়নিক সরানোর তোড়জোড়ও স্তিমিত হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের আলোচনা ও মানুষের স্মৃতি থেকে ট্র্যাজেডির ক্ষত মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতাও ফিকে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ হাজার গুদামের প্রায় ১৫ হাজারই আবাসিক বাসাবাড়িতে।
আরমানিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের ড্রাম ও দাহ্য রাসায়নিকে ঠাসা দোকান সারি সারি। কোথাও বস্তাভর্তি রাসায়নিক রাখা। এর ওপরেই মাকড়সার জালের মতো ঝুলছে এলোমেলো বৈদ্যুতিক তার। কোনো কোনো দোকানের ঠিক ওপরের তলাতেই আবাসিক ফ্ল্যাট। আবাসিক ভবনের নিচতলার বড় অংশে রয়েছে বিপজ্জনক কারখানা ও গুদাম। সেখানে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পারক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কিটোন, থিনার ও আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের মতো দাহ্য রাসায়নিক মজুত থাকে। সামান্য আগুনের সংস্পর্শে এলেই এসব রাসায়নিক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশে রাসায়নিক গুদাম সরানো থেকে শুরু করে জনসচেতনতা পর্যন্ত একাধিক বিষয় রয়েছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে রাসায়নিক, প্লাস্টিক কাঁচামাল ও দাহ্য পদার্থের গুদাম ও কারখানা অবিলম্বে বিসিক রাসায়নিক শিল্পনগরীর মতো নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে সরানোর কথা বলা হয়েছে। আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে রাসায়নিক মজুতকারীদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থার সুপারিশও আছে।
ভবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড শতভাগ মানা, বহুতল ভবন ও মার্কেটে পর্যাপ্ত প্রশস্ত জরুরি বহির্গমন পথ রাখা, যা মালামাল রেখে বা তালা দিয়ে আটকানো যাবে না, এবং প্রতিটি ভবনে ফায়ার ডিটেক্টর, অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার ও হোস পাইপ ব্যবস্থা সচল রাখার কথা বলা হয়েছে। পানির সংকট মেটাতে প্রধান সড়কের মোড়ে ও বড় মার্কেটের পাশে ফায়ার হাইড্রেন্ট বসানো এবং এলাকার পুকুর ও প্রাচীন জলাশয় ভরাট না করার সুপারিশও রয়েছে।
সরু গলির সমস্যা মেটাতে পর্যায়ক্রমে সড়ক প্রশস্ত করার পরিকল্পনা এবং বড় গাড়ি ঢোকার বাধা না কাটা পর্যন্ত দ্রুতগতির মোটরসাইকেল ইউনিট ও ওয়াটার-মিস্টবাহী ছোট গাড়ি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া শর্টসার্কিট ও গ্যাস লিকেজ থেকে অধিকাংশ আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় তিতাস, ডেসকো ও ডিপিডিসির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ তার, ট্রান্সফরমার ও গ্যাস লাইন নিয়মিত পরীক্ষা ও সংস্কারের সুপারিশ আছে। পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও বাসিন্দাদের নিয়ে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়া এবং প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের মতে, পুরান ঢাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করতে রাজউক, সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টার ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির অন্যতম সুপারিশ ছিল আবাসিক এলাকায় যেকোনো ধরনের রাসায়নিকের দোকান বা গুদাম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা। ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, কিছু স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বেশির ভাগই থমকে আছে।
চকবাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মতিন বলেন, নিমতলীর ঘটনার পর সরকার সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক অঞ্চল বা জায়গা দেওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত তা তাঁরা পাননি। নিরাপদ পরিবেশে যে ব্যবসা করা উচিত, তা গড়ে তোলা যাচ্ছে না। বিসিকের নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবসা সরলে ঝুঁকি অনেকটাই কমত বলে তিনি মনে করেন। ব্যবসায়ীদের সাধারণ দাবি, ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত রাসায়নিক অঞ্চল হলে তাঁরাও লাভবান হতেন।
এই চিত্রে সমস্যার মূল জায়গাটি স্পষ্ট। ঝুঁকি কোথায়, তা সবাই জানে। সমাধানের তালিকাও তৈরি। কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব একাধিক সংস্থার মধ্যে ছড়িয়ে থাকায় কেউই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহির মুখে পড়ছে না। ফায়ার সার্ভিস সুপারিশ দিতে পারে, কিন্তু গুদাম সরানো, লাইসেন্স বাতিল, সড়ক প্রশস্ত করা কিংবা হাইড্রেন্ট বসানোর ক্ষমতা তার হাতে নেই। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিকল্প জায়গা না দিয়ে উচ্ছেদ চলবে না। অর্থাৎ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া শুধু নির্দেশ কাজ করবে না, আবার নির্দেশ ছাড়া পুনর্বাসনও এগোবে না।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ২৫ হাজার গুদামের মধ্যে লাইসেন্স আছে মাত্র আড়াই হাজারের। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক গুদাম আইনি তদারকির বাইরে চলছে। এর বড় অংশ আবাসিক ভবনে, ফলে একটি দুর্ঘটনা শুধু ব্যবসায়ী নয়, পুরো পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলে। এসব তথ্য একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতে এসেছে, সরকারি হিসাবের সঙ্গে তা মেলানো হয়নি।
তবে কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। সোমবারের আগুনে কোনো হতাহত হয়েছে কি না, আগুনের কারণ কী এবং ক্ষতির পরিমাণ কত, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। সিটি করপোরেশন বা রাজউকের পক্ষ থেকে সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। কোন সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্যও নেই।
সব মিলিয়ে নিমতলী ও চুড়িহাট্টার পর পাঁচ-ছয় বছর কিংবা তারও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পুরান ঢাকার মৌলিক ঝুঁকি রয়ে গেছে। কোনো একটি সংস্থাকে সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়ে সময়সীমাসহ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ করা এবং রাসায়নিক শিল্পনগরী চালু করে ব্যবসায়ীদের জন্য কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত করা ছাড়া এই আতঙ্ক কাটবে বলে মনে হয় না।

