‘ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ ১৩ অক্টোবর দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, মহড়া ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অংশ নিচ্ছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রত্যাশী এবং এর তরুণ স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক ‘ইউথ ভলান্টিয়ার অ্যালায়েন্স’ (YVA)।
দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে এসব ঝুঁকির পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সংকটও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন দ্রুত সাড়া এবং পরবর্তী পুনর্বাসনে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাশী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নয়ন ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, জনসচেতনতা সৃষ্টি, আগাম প্রস্তুতি এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের সহায়তায় সংস্থাটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। গ্রামীণ এলাকার পাশাপাশি নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি।
বিশেষ করে ঢাকায় ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও জলাবদ্ধতার মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে কাজ করছে প্রত্যাশীর ইউথ ভলান্টিয়ার অ্যালায়েন্স। জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক তথ্যব্যবস্থা (NVIS)-এর সঙ্গে যুক্ত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তরুণদের দুর্যোগ প্রস্তুতি ও সাড়াদান কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় এ নেটওয়ার্কে প্রায় ২৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আজ সকালে ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রত্যাশীর ইউথ ভলান্টিয়ার অ্যালায়েন্সের প্রায় ৫৫০ জন নগর স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন। অনুষ্ঠানের মহড়া ও প্রদর্শনীতে ভূমিকম্প, বন্যা ও অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষা, প্রাথমিক সাড়া এবং উদ্ধার কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত তরুণদের প্রস্তুত রাখা এবং সরকারি সংস্থার সঙ্গে তাঁদের সমন্বয় জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
ঢাকার জাতীয় আয়োজনের পাশাপাশি ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জেও দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি ও স্থানীয় কর্মসূচিতে প্রত্যাশীর স্বেচ্ছাসেবকেরা অংশ নেন। সংস্থাটির নিজস্ব কর্মএলাকাগুলোতেও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদারে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রত্যাশীর উপপরিচালক ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ড. নাসির উদ্দিন বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য তরুণদের মধ্যে দায়িত্বশীল মানসিকতা গড়ে তোলা, যাতে তাঁরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুর্যোগ মোকাবিলা, সামাজিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। এ লক্ষ্যেই আমরা ইউথ ভলান্টিয়ার অ্যালায়েন্স গড়ে তুলেছি। এর সদস্যরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। পাশাপাশি কৃষি ও কৃষিভূমি সংরক্ষণসহ দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নেতৃত্বের বিকাশ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। বিশেষ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক, পরিবেশগত ও দুর্যোগসংক্রান্ত সমস্যার কার্যকর সমাধানে তরুণেরা যেন অবদান রাখতে পারেন, সে লক্ষ্যেই প্রত্যাশী কাজ করে যাচ্ছে।”
জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেন এবং মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল আলম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান।
দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মহড়া এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রত্যাশীর ইউথ ভলান্টিয়ার অ্যালায়েন্সের মতো তরুণদের সংগঠিত নেটওয়ার্ক এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং আরও নিরাপদ ও দুর্যোগসহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এ ধরনের কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।

