সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার জেরে বিভিন্ন বিমানবন্দরে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে সাতটি নির্দেশনা দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জানানো, নতুন করে টিকিট বুকিং ও অর্থ ফেরতে সহায়তা এবং ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার কথা এতে বলা হয়েছে।
গতকাল সোমবার রাতে শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এসব নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দরের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাই দেশটিতে সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব সংস্থাকে অবিলম্বে নির্দেশনাগুলো কার্যকর করতে হবে।
নির্দেশনায় প্রথমে তথ্য জানানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব ও সময়সূচি পরিবর্তনের খবর যাত্রীদের মুঠোফোনে খুদে বার্তা, ফোনকল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা উপায়ে জানাতে হবে। ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি, পুনরায় টিকিট বুকিং, অর্থ ফেরত এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ব্যবস্থা সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য দিতে বলা হয়েছে। ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসতে নিষেধ করতে হবে। এতে অকারণে বিমানবন্দরে ভিড় ও ভোগান্তি কমবে বলে ধারণা করা যায়।
ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা অভিবাসনসংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে যাত্রীদের সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিতে হবে। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময়সীমায় থাকা কর্মীদের জন্য এটি বড় উদ্বেগের জায়গা।
যাঁরা ইতিমধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছেন, তাঁদের জন্য বসার জায়গা, পানীয় জল, হালকা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে বলেছে বেবিচক। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীর প্রতি বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে।
প্রতিটি উড়োজাহাজ সংস্থাকে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করতে হবে। তাঁর নাম, পদবি, মুঠোফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা দ্রুত শাহজালাল বিমানবন্দরের ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা বিভাগকে জানাতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিনিধি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাত্রীদের সহায়তা ও ফ্লাইটসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করবেন। বেবিচক আরও বলেছে, কোনো যাত্রীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না। যাত্রীদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে এবং সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে।
সৌদির বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটের ৬২টি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে। এতে ৯ হাজার ৬৭৪ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গতকাল বিকেল পর্যন্ত পাওয়া বেবিচকের এই হিসাবে রিয়াদ এয়ারের যাত্রীরা অন্তর্ভুক্ত নন।
সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নয়টি, ইউএস-বাংলার দুটি, সৌদিয়ার পাঁচটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে। এ ছাড়া ইন্ডিগো, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ফ্লাইদুবাই, সালাম এয়ার ও ইজিপ্ট এয়ারের ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইটও এর আওতায় পড়েছে। বিমান বাংলাদেশ ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে। ইউএস-বাংলা ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের সব ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল করেছে।
এই নির্দেশনার তাৎপর্য হলো, সংকটের সময় যাত্রীর অধিকার ও দায়িত্বের জায়গাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনা। এর আগে বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর জানতে পারার ঘটনা ঘটেছে। নতুন নির্দেশে আগেভাগে জানানো এবং নিশ্চিত না হয়ে বিমানবন্দরে না আসতে বলার কথা যুক্ত হওয়ায় সেই সমস্যা কিছুটা কমতে পারে। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগের শর্ত যাত্রীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট যোগাযোগের জায়গাও তৈরি করবে।
তবে নির্দেশনা কতটা মানা হচ্ছে, তা তদারকির কোনো ব্যবস্থার কথা চিঠির বিবরণে নেই। অর্থ ফেরত কত দিনের মধ্যে হবে, তারিখ পরিবর্তনে বাড়তি ফি লাগবে কি না কিংবা নির্দেশ না মানলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। বিভিন্ন সূত্রে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীর সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন এসেছে, কারণ হিসাবের সময় ও পদ্ধতি আলাদা। রিয়াদ এয়ারের যাত্রীদের বাদ দেওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সময়সীমা অনিশ্চিত থাকায় আটকে পড়া কর্মীদের জন্য এয়ারলাইনগুলোর বাস্তব সহায়তাই এখন মূল পরীক্ষা। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে ভিসা ও কাজে যোগদানের সময় বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে কর্মীদের ঝুঁকি অনেকটা কমবে।

