অকেজো মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ কিংবা ব্যাটারি দেশের ঘরে ঘরে জমছে। কেউ এসব বিক্রি করছেন ভাঙারি দোকানে, কেউ ফেলে দিচ্ছেন সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে। অথচ ই-বর্জ্য সংগ্রহ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনর্ব্যবহারের কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি। আজ বুধবার আন্তর্জাতিক ই-বর্জ্য দিবসে এই অব্যবস্থাপনাই আবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মাটি, পানি ও বাতাসের দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
বিশ্বজুড়েই ই-বর্জ্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে ৬ কোটি ২০ লাখ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও পুরোনো ও অকেজো ইলেকট্রনিক পণ্যের পরিমাণ বাড়ছে। তবে দেশে বছরে কতটা ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার কতটা নিরাপদে পুনর্ব্যবহার হচ্ছে আর কতটা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই।
একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার টন। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ টনে। বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালে এই পরিমাণ ৪৬ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে বলে ওই সমীক্ষায় আশঙ্কা করা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা চালায়। ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, ভোক্তা পর্যায়ে ই-বর্জ্য সংগ্রহের প্রায় ৯৭ শতাংশই হয় অনানুষ্ঠানিক খাতে। অথচ এ খাতে পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মাত্র সাতটি। অর্থাৎ বর্জ্যের বড় অংশ এমন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে নিয়মিত তদারকি প্রায় নেই।
ই-বর্জ্যে সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকে। এগুলো অনিরাপদভাবে ছড়িয়ে পড়লে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। স্বাস্থ্যবিদদের মতে, সিসার সংস্পর্শে শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। পারদ স্নায়ুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, আর ক্যাডমিয়াম কিডনি ও হাড়ের ক্ষতি করতে পারে। পুরোনো যন্ত্র ভাঙা, পোড়ানো বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ধাতু আলাদা করার সময় যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে এসব উপাদানের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন ই-বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতের কাজে যুক্ত শ্রমিকেরা। অনানুষ্ঠানিক খাতে অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা গ্লাভস, চোখ ও শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই কাজ করেন। খোলা জায়গায় তার ও প্লাস্টিক পোড়ানোর সময় ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণার সংস্পর্শে আসেন তাঁরা। একই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন আশপাশের বাসিন্দারাও, কারণ বিষাক্ত উপাদান মাটি ও পানিতে মিশলে দূষণ কর্মস্থলের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে যায়। ঝুঁকি কমাতে যন্ত্র নিরাপদে খোলা, বিপজ্জনক উপাদান আলাদা করা, সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার ও ক্ষতিকর বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ জরুরি। কিন্তু বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় এসবের নিশ্চয়তা মিলছে না।
সমস্যার শুরু আসলে ভোক্তার হাত থেকেই। টিআইবির গবেষণায় ৬৭৫ জনের ওপর অনলাইন জরিপ চালানো হয়। এতে ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, অকেজো ইলেকট্রনিক পণ্য নিরাপদে ফেলার বিষয়ে তাঁরা কোনো নির্দেশনা পান না। ৭২ শতাংশের ঘরে অকেজো পণ্য পড়ে আছে। মাত্র ১৫ শতাংশ তা ফেলে দিয়েছেন বা অন্যভাবে সরিয়েছেন, যাঁদের অনেকে পুরোনো পণ্য বিক্রি করেছেন ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে। আর ৭৩ শতাংশ জানিয়েছেন, অকেজো পণ্য ফেরত নেওয়ার কোনো প্রস্তাবই তাঁরা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পান না।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, পণ্যের ব্যবহার শেষ হলে তা কোথায় জমা দিতে হবে, কে সংগ্রহ করবে এবং কীভাবে নিরাপদে প্রক্রিয়াজাত হবে, তা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। ঘরে পড়ে থাকা বা ভাঙারি দোকানে বিক্রি হওয়া ই-বর্জ্য শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, তারও কার্যকর নজরদারি নেই।
আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দুর্বল। ২০২১ সালে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা করা হয়েছে। এতে উৎপাদক ও আমদানিকারকদের পুরোনো পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ধাপে ধাপে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর কথা বলা আছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সংগ্রহকেন্দ্র নেই, নজরদারিও দুর্বল। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতেও ই-বর্জ্য জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই।
নিবন্ধন ব্যবস্থায়ও সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। বিটিআরসিতে নিবন্ধিত ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটি পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত নয়। ফলে বিধিমালা থাকলেও নিরাপদ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের কার্যকর কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
এই দুর্বলতার প্রভাব পড়ছে আমদানি-রপ্তানিতেও। কাস্টমসের তথ্য বিশ্লেষণ করে টিআইবি জানিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজার ৯৮৫ টন ই-বর্জ্য উপাদান আমদানি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৪০ টন। গবেষণায় বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক খাতের কিছু পাইকারি ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় নজরদারি ছাড়াই প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডসহ বিভিন্ন ই-বর্জ্য উপাদান বিদেশে পাঠাচ্ছেন। কিছু নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাসেল কনভেনশনের আওতায় অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে বেশি বর্জ্য রপ্তানির অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া নিবন্ধন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
তবে ই-বর্জ্য শুধু সমস্যা নয়, এতে লুকিয়ে আছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও। এসব বর্জ্যে তামা, সোনা, রুপা, অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, নিকেল ও প্যালাডিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতু থাকে। পুরোনো মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সার্কিট বোর্ড, তার ও ব্যাটারি থেকে এগুলো উদ্ধার করে শিল্পে আবার ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষ করে সার্কিট বোর্ড, মেমোরি চিপ ও প্রসেসরে সোনা, রুপাসহ নানা মূল্যবান ধাতু মেলে। তার ও কেবল থেকে পাওয়া যায় তামা, আর যন্ত্রের কাঠামো থেকে অ্যালুমিনিয়াম ও লোহা। এসব উপাদান পুনর্ব্যবহার করা গেলে কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
ই-বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়। এ খাতের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই মূল্যের কতটা মূল্যবান ধাতু থেকে আসে এবং তার কতটা দেশে উদ্ধার বা পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত প্রযুক্তি ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতের ঘাটতির কারণে ই-বর্জ্যের মূল্যবান উপাদানের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
টিআইবির গবেষণায় ঢাকার অনানুষ্ঠানিক সংগ্রহস্থলগুলোতে বছরে প্রায় ১ হাজার ১৭৩ টন ই-বর্জ্য সংগ্রহের হিসাব মিলেছে। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে প্রায় ৩১ টন তামা উদ্ধার সম্ভব। গবেষণার হিসাবে, শুধু এই তামার বাজারমূল্যই বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
সুমন আহমেদ সাবির মনে করেন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে আগে বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিরাপদ করতে হবে। বিষাক্ত অংশ আলাদা করে নিষ্পত্তি, শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং উৎপাদক ও আমদানিকারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে চিত্রটা উদ্বেগজনক। একদিকে ই-বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতের প্রায় পুরোটাই চলছে অনানুষ্ঠানিক পথে, যেখানে শ্রমিকের সুরক্ষা ও পরিবেশ রক্ষার নিশ্চয়তা কম। বিধিমালা থাকলেও সংগ্রহকেন্দ্র, নজরদারি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে তার সুফল মিলছে না। আবার সঠিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই বর্জ্যই হয়ে উঠতে পারে মূল্যবান সম্পদ, কর্মসংস্থান ও কাঁচামাল সাশ্রয়ের উৎস। ফলে নীতিনির্ধারক, উৎপাদক-আমদানিকারক ও ভোক্তা, তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই এখন সময়ের দাবি।

