দেশের বিভিন্ন এলাকায় দোকানে দোকানে খুঁজেও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) মিলছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এর মধ্যেই সরবরাহ সংকটের সমাধান ও কমিশন বাড়ানোর দাবিতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ও পরদিন শুক্রবার সারাদেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবে এই দামে সিলিন্ডার মিলছে না। কোথাও কোথাও ক্রেতাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬৬৩ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। কক্সবাজারে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম উঠেছে ২ হাজার ২০০ টাকায়, নরসিংদীতে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত, আর কিশোরগঞ্জে ২ হাজার ১০০ টাকায়।
কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা এমরান ফারুক অনিক দুই মাস আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছিলেন ১ হাজার ৭০০ টাকায়। মঙ্গলবার গ্যাস শেষ হয়ে গেলে নতুন সিলিন্ডার কিনতে তাঁকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে একই পরিমাণ গ্যাসের জন্য খরচ বেড়েছে ৫০০ টাকা। তিনি বলেন, তাঁদের আয় খুবই সীমিত। গ্যাসের পেছনে এত টাকা খরচ করায় সংসার চালানো কঠিন হবে, বাজার-সদাই করতেও সমস্যা হবে।
কক্সবাজার সদর থানার পেছনের সড়কে চায়ের দোকান চালান সিজল দে। দুদিন আগে তিনিও ২ হাজার ২০০ টাকায় একটি সিলিন্ডার কিনেছেন। শহরের বাহারছড়া, নুনিয়াছড়া, কলাতলী, আলীর জাহাল, জেলগেট, পেশকারপাড়া, নুরপাড়া ও বাস টার্মিনাল এলাকায় খোঁজ নিয়ে বাড়তি দামে বিক্রি এবং অনেক দোকানে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। সাড়ে ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম চাওয়া হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, ২৫ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার ৭ হাজার থেকে ৭ হাজার ২০০ টাকা। শহরের ফুডজোন রেস্টুরেন্টের মালিক রেজাউল করিম জানান, সপ্তাহখানেক আগে তিনি ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছিলেন ১ হাজার ৮০০ টাকায় এবং ৩৫ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার টাকায়। মঙ্গলবার তিনি কোথাও গ্যাস পাননি।
কিশোরগঞ্জ শহরের খরমপট্টি এলাকার বাসিন্দা বিজন কুমার সরকার জানান, আগে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা, তবু তাঁকে কিনতে হতো ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। এখন দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারিত হলেও বিক্রেতারা চাইছেন ২ হাজার ১০০ টাকা।
সংকটের কারণ নিয়ে ব্যবসায়ী ও কোম্পানির মধ্যে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। এলপিজি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দাবি, গত ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমদানিকারকেরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকেও সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
কক্সবাজার এলপি গ্যাস পরিবেশক সমিতির সভাপতি সিরাজুল হক জানান, ৬ অক্টোবর তিনি ডিলারের কাছ থেকে প্রতিটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৫০ টাকায়, যা সরকার নির্ধারিত খুচরা দামের চেয়েও বেশি। তিনি বিক্রি করছেন ২ হাজার ২০০ টাকায়। জেলা এলপিজি সমিতির সভাপতি সরওয়ার আলমের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো নির্ধারিত দামে ডিলারদের গ্যাস দিচ্ছে না। বেশি দামে সিলিন্ডার কেনার পরও ভাউচার দেওয়া হচ্ছে না।
তবে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দাবি করেছে, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত আছে। সংগঠনটি বলছে, নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কক্সবাজার জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাসান-আল-মারুফ জানান, বাজার তদারকির পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান চলছে। এলপিজি সরবরাহকারীদের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এর মধ্যে গত সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারাদেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সংগঠনটির সভাপতি মো. সেলিম খান জানান, পরিবেশকদের কমিশন সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ করতে হবে। এ ছাড়া চালানে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ, পরিবহন ভাড়া পরিশোধ ও অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধসহ আরও ছয়টি দাবি রয়েছে তাঁদের। দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ সংকটের মধ্যে দুদিনের ধর্মঘট কার্যকর হলে সাধারণ ক্রেতাদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।
পুরো পরিস্থিতিতে একটি বড় অসংগতি স্পষ্ট। একদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানিকারকেরা সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে লোয়াবের দাবি, সরবরাহ পর্যাপ্ত। এই দুই বক্তব্যের কোনটি সঠিক, তা স্বতন্ত্র তথ্যে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সংকটের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ক্রেতার দিক থেকে ফল একই: নির্ধারিত দামে গ্যাস মিলছে না, আর যেখানে মিলছে সেখানে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে।
সরকার দাম বাড়ানোর পরও বাজারে নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ায় বোঝা যায়, শুধু দাম নির্ধারণ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ডিলার পর্যায়েই যদি সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে কিনতে হয় এবং ভাউচার না মেলে, তাহলে খুচরা বিক্রেতার পক্ষে সরকারি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। ফলে সংকটের দায় কার, তা নির্ধারণে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে, অর্থাৎ আমদানিকারক, ডিপো, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার পর্যায়ে, স্বচ্ছ নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশকদের কমিশন বাড়ানোর দাবি কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও আলোচনার সুযোগ আছে, কারণ কমিশন বাড়লে সেই চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।
নিম্ন আয়ের পরিবার ও ছোট খাবারের দোকানের জন্য এই সংকট বিশেষভাবে কঠিন, কারণ রান্নার গ্যাসের বিকল্প খুঁজে পাওয়া তাঁদের জন্য সহজ নয়। ধর্মঘট কার্যকর হলে দুদিন বাজারে এলপিজি পাওয়া আরও দুষ্কর হবে। তাই এখন সরকারি তদারকি সংস্থা, কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের আলোচনায় দ্রুত সমাধানে পৌঁছানোই হবে ক্রেতাদের ভোগান্তি কমানোর প্রধান উপায়।

