রাজধানীর চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী পাঠানোর নতুন পরিকল্পনা করছে সরকার। এসব রোগীর চিকিৎসা, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় সরকারি অর্থে বহন করা হবে। একদিকে বড় সরকারি হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর চাপ কমানো, অন্যদিকে তুলনামূলক কম রোগী থাকা বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো—এই দুই লক্ষ্য সামনে রেখে পরীক্ষামূলকভাবে উদ্যোগটি নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইমপালস হাসপাতাল, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে এই উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফল সন্তোষজনক হলে ভবিষ্যতে আরও হাসপাতালকে এর আওতায় আনা হতে পারে।
তবে রোগীপ্রতি সরকার কত টাকা দেবে, কোন চিকিৎসার জন্য কী হারে বিল পরিশোধ করা হবে এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে আর্থিক সমন্বয় কীভাবে হবে—এসব বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এই পরিকল্পনার পেছনে অন্যতম কারণ হলো নির্বাচিত কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগী না থাকা। চিকিৎসা শিক্ষায় শুধু শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠ নয়, রোগী দেখে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কম হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব চিকিৎসাসেবা পর্যবেক্ষণ এবং অনুশীলনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, মেডিকেল শিক্ষার নীতিমালা অনুযায়ী ১০০ শিক্ষার্থীর জন্য ৫০০ শয্যার হাসপাতাল থাকা প্রয়োজন। তবে শুধু শয্যা বা ভবন থাকলেই যথেষ্ট নয়, সেখানে নিয়মিত পর্যাপ্ত রোগীও থাকতে হবে। রোগী না থাকলে ব্যবহারিক চিকিৎসা শিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন জানিয়েছেন, কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও রোগীর সংখ্যা কম। বিভিন্নভাবে রোগী বাড়ানোর চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগী পাঠানো হলে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
নির্বাচিত হাসপাতালগুলোর মধ্যে তেজগাঁওয়ের শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৫০০ শয্যা রয়েছে। ইমপালস হাসপাতালে রয়েছে ৪০০ শয্যা। গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ৫০০ শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করেই হাসপাতালগুলো প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের একটি দল প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শনও করেছে।
শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ কমাতে তাদের হাসপাতালে রোগী পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। হাসপাতাল প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেবে এবং সরকার সেই চিকিৎসার ব্যয় পরিশোধ করবে।
তার মতে, মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি বিভাগের কিছু রোগী বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো গেলে সরকারি হাসপাতালের মেঝে বা বারান্দায় রোগী রেখে চিকিৎসা দেওয়ার পরিস্থিতি কমানো সম্ভব হতে পারে।
বর্তমানে ঢাকার বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপ রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যা ২ হাজার ৬০০ হলেও প্রতিদিন প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন বলে স্বাস্থ্য বিভাগসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ১ হাজার ৩৫০ শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি।
অন্যদিকে নির্বাচিত কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে শয্যার বড় অংশ খালি থাকার চিত্র দেখা গেছে। শমরিতা হাসপাতালে পরিদর্শনের সময় পুরো হাসপাতালে ৬৭ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। ইমপালস হাসপাতালেও রোগীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা গেছে, যদিও কর্তৃপক্ষ সেখানে ভর্তি রোগীর নির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন করে হাসপাতাল নির্মাণের তুলনায় ইতোমধ্যে থাকা বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত শয্যা ব্যবহার করলে দ্রুত সেবা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের মতে, নতুন করে ১০০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে এবং ব্যয় ৫০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। তার বিপরীতে বিদ্যমান বেসরকারি হাসপাতালের খালি শয্যা কাজে লাগানো গেলে কম সময়ে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো সম্ভব।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একটি সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের সমন্বয় রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। কোন রোগীকে কখন এবং কীভাবে সেখানে পাঠানো হবে, সে বিষয়ে পৃথক নীতিমালা তৈরি হচ্ছে।
খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোগীর শয্যা খরচ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি, সরকার নির্ধারিত ওষুধ এবং সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় সরকার বহন করবে। মাস শেষে প্রদত্ত সেবার হিসাব অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালকে অর্থ পরিশোধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে রোগী সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে কীভাবে যাবেন, পরিবহনের দায়িত্ব কে নেবে, জরুরি অবস্থায় চিকিৎসার দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং অস্ত্রোপচার পর্যন্ত কোন কোন সেবা এর আওতায় থাকবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান জানিয়েছেন, কোন কোন হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন রোগী পাঠানোর পদ্ধতি এবং চিকিৎসাসেবার পরিধি নির্ধারণে কাজ চলছে।
সরকারি অর্থ বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম ঠেকানোও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এজন্য পুরো ব্যবস্থাকে সফটওয়্যারনির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রোগী পাঠানো থেকে শুরু করে হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ছাড়পত্র পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি হাসপাতালের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য সাত সদস্যের একটি তদারকি কমিটি রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, এভাবে তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে ভুয়া রোগী দেখিয়ে বিল তৈরি, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো কিংবা চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়ে দেখানোর মতো অনিয়ম কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
তবে চারটি নির্দিষ্ট হাসপাতাল কীভাবে নির্বাচন করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাদের মতে, উন্মুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাসপাতাল নির্বাচন করলে স্বচ্ছতা আরও বাড়তে পারত।
অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান মনে করেন, কোন হাসপাতালের চিকিৎসার মান, চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল, যন্ত্রপাতি এবং অবকাঠামো কেমন—এসব মূল্যায়নের জন্য সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন হাসপাতাল কী ধরনের রোগী নেবে এবং কোন সেবার জন্য সরকার কত টাকা দেবে, তা আগেই নির্ধারণ করা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বিল ব্যবস্থাপনাকেও এই উদ্যোগের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হিসেবে দেখছেন। কার্যকর নজরদারি না থাকলে প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় বেশি রোগী দেখানো, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরীক্ষা করানো কিংবা খরচ বাড়িয়ে বিল জমা দেওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
করোনা মহামারির সময় সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার বিল নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবার আরও কঠোর যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি অর্থ ব্যয়ের আগে রাজধানীতে থাকা সরকারি অব্যবহৃত অবকাঠামো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় কি না।
উদাহরণ হিসেবে ডিএনসিসি কোভিড-১৯ হাসপাতালের কথা উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। করোনাকালে নির্মিত এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে ২১২টি নিবিড় পরিচর্যা শয্যা রয়েছে। হাসপাতালটির উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকায় সেটিকে পূর্ণাঙ্গ সাধারণ হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা যাচাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো, ঢাকার হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা চাপ কমানোর দীর্ঘমেয়াদি উপায় কী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ও অধ্যাপক বেনজির আহমেদের মতে, শুধু ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালের রোগী অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা বাড়াতে পারলে রোগীদের ঢাকায় আসার প্রবণতা কমবে।
তাদের মতে, রাজধানীর বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় হাসপাতাল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ কমাতে প্রাথমিকভাবে চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শয্যা খালি থাকার বিষয়টি বিবেচনা করেই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
সরকার ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে চিকিৎসা ব্যয় ভাগাভাগির কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও আলোচনায় রয়েছে। আর্থিক কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হবে।
এই উদ্যোগ সফল হলে একসঙ্গে দুটি সমস্যার সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে—সরকারি হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর চাপ কিছুটা কমবে এবং রোগী কম থাকা বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বাস্তব চিকিৎসা প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন।
তবে পরিকল্পনাটির সাফল্য নির্ভর করবে হাসপাতাল নির্বাচনের স্বচ্ছতা, চিকিৎসার মান, রোগী রেফার করার নিয়ম, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং বিল যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থার ওপর। এগুলো নিশ্চিত করা না গেলে রোগীর চিকিৎসা ও মেডিকেল শিক্ষার উন্নয়নের উদ্দেশ্যে নেওয়া উদ্যোগটি উল্টো নতুন আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

