জাতীয় অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর কিংবা জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, এমন সংবাদ প্রকাশের বিরুদ্ধে নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা চেয়েছে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। গুজব, ভুয়া খবর ও ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ক্ষমতা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি।
পাশাপাশি শাস্তি হিসেবে সাংবাদিকদের আর্থিক জরিমানার বিধান আইনে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। তবে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এসব প্রস্তাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেস কাউন্সিলের দেওয়া এক লিখিত প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে এখনো আলোচনা হয়নি। গতকাল মঙ্গলবারের বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ছিল তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল ও গণমুখী করার করণীয়। সেই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৪টি প্রতিষ্ঠান লিখিত প্রস্তাব দেয়। এর একটি ছিল ‘বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সার্বিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও গণমুখীকরণের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা’। প্রেস কাউন্সিলের সচিব ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. আবদুস সবুরের সই করা এই প্রতিবেদন কমিটিতে জমা দেওয়া হয়।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, মানোন্নয়ন ও মান সংরক্ষণের পাশাপাশি অপসাংবাদিকতা ও অপপ্রচার ঠেকাতে ১৯৭৪ সালের প্রেক্ষাপটে তৈরি প্রেস কাউন্সিল আইন যুগোপযোগী করা জরুরি। এ জন্য আইনে মোট ১৯টি এখতিয়ার বা ক্ষমতা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও সনদ প্রদান, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে কাউন্সিলের আওতায় আনা এবং সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি তৈরি। স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা ও হামলার ঘটনায় তদন্ত ও সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতাও চাওয়া হয়েছে। আর্থিক স্বনির্ভরতার জন্য সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যার ভিত্তিতে লেভি বা চাঁদা আদায়ের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও আছে।
স্বপ্রণোদিত তদন্ত প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, সম্পাদক, প্রকাশক বা সাংবাদিক জাতীয় অখণ্ডতা, স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর, জনরুচি ও আচরণবিধির পরিপন্থী কিংবা জনস্বার্থবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করলে বা গুজব, ভুয়া খবর ও ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ালে কাউন্সিল নিজ উদ্যোগে তদন্ত ও আদেশ দিতে পারবে, এমন বিধান আইনে থাকা দরকার। একই সঙ্গে স্বাধীন সংবাদ প্রচারে হস্তক্ষেপ, হামলা বা মবের ঘটনায় অভিযোগ পেলে, কিংবা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকলে, স্বপ্রণোদিতভাবে তদন্ত ও সুরক্ষার নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ারও চাওয়া হয়েছে।
প্রেস কাউন্সিল বর্তমানে একটি আধা বিচারিক প্রতিষ্ঠান। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জেলা জজ মর্যাদার একজন বিচারককে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সাংবাদিকদের অধিকার সুরক্ষা ও পেশাগত অসদাচরণের বিচার শুধু কাউন্সিলের অধীনে সম্পন্ন করার ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন। মিথ্যা, হয়রানিমূলক বা জনরুচিবিরোধী সংবাদ প্রকাশ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে আর্থিক জরিমানাসহ কার্যকর বিধানও চাওয়া হয়েছে।
অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও একটি বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কেউ অভিযোগ করলে কাউন্সিল প্রথমে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পত্রিকার সম্পাদকের কাছে মীমাংসার নির্দেশনা দেবে। সম্পাদক অভিযোগকারীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করবেন।
আচরণবিধি প্রসঙ্গে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এটি মানার বাধ্যবাধকতা না থাকায় সাংবাদিকেরা নীতিনৈতিকতা মেনে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে যথেষ্ট সচেতন নন। তাই আচরণবিধি গেজেটে প্রকাশের বিধান আইনে যুক্ত করতে হবে, আর বিধিটি তৈরি করবে কাউন্সিল। এ ছাড়া কোনো সাংবাদিক একই সময়ে একাধিক পেশায় নিয়োজিত থাকলে তা পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে আইনে সুস্পষ্ট করার কথাও বলা হয়েছে।
এই উদ্যোগ নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। তাঁর মতে, প্রেস কাউন্সিল বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বপ্রণোদিত ব্যবস্থার ক্ষমতা দিলে আইন-আদালতের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। এ ধরনের ক্ষমতা গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা হবে। অতীতে আওয়ামী লীগের আমলেও এমন বিধান করার চেষ্টা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো একই চেষ্টা হলে তা দুর্ভাগ্যজনক। তাঁর ভাষ্য, প্রেস কাউন্সিলের বর্তমান ক্ষমতাই তারা প্রয়োগ করতে পারে না, তাই অনেকে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বলে মনে করেন। আইন সংশোধন করতে হলে আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, প্রেস কাউন্সিলকে বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানোর একটি বিভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। এটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা, তাই একে স্বপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবে সম্প্রচারমাধ্যমকে কাউন্সিলের আওতায় আনার কথা নেই; এ জন্য কি আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ সরকারের গ্রহণ করা উচিত ছিল, কিন্তু এখন খণ্ডিতভাবে কিছু বিষয় রাখা হয়েছে। প্রেস কাউন্সিলের মতো ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করে গণমাধ্যমের উপকার হবে না। বরং এটি বিলুপ্ত করে বিএনপির প্রতিশ্রুত স্বাধীন ও স্থায়ী কমিশন গঠন করা উচিত।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে সংশোধনীর খসড়ায় মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দেয়, তবে শেষ পর্যন্ত আইন সংশোধন হয়নি। তখনো অর্থদণ্ড ও স্বপ্রণোদিতভাবে অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতার প্রস্তাব ছিল। প্রথমে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের কথা বলা হলেও নীতিগত অনুমোদনের সময় অঙ্কটি বাদ দেওয়া হয়। তখন নোয়াব প্রস্তাবিত সংশোধনীকে অস্পষ্ট ও অপব্যবহারের সুযোগযুক্ত বলে আপত্তি জানিয়েছিল। বিশেষ করে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর বা অবমাননাকর বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় তারা উদ্বেগ জানায়।
প্রস্তাবগুলোর কিছু দিক নিয়ে বিতর্কের সুযোগ আছে। গুজব ও ভুয়া খবর ঠেকানোর প্রয়োজন সবাই স্বীকার করলেও, ‘জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন’ বা ‘জাতীয় অখণ্ডতার জন্য ক্ষতিকর’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিলে তার অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। কোন সংবাদ ক্ষতিকর, তা নির্ধারণের স্পষ্ট মানদণ্ড ও আদালতের মতো নিরপেক্ষ পর্যালোচনার ব্যবস্থা না থাকলে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আবার সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের মতো বিষয়ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার হাতে থাকলে পেশার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অন্যদিকে প্রেস কাউন্সিল নিজেই সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মবের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা চাওয়ায় এর একটি ইতিবাচক দিকও আছে, তবে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে থাকবে, তা এখানে স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদনটি এখনো সংসদীয় কমিটিতে আলোচনায় ওঠেনি। কমিটি এটি কীভাবে বিবেচনা করে, আইন সংশোধনের উদ্যোগ আদৌ এগোয় কি না এবং সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক সংগঠন ও অন্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

