রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল পিএলসির ডলার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সরকার সময় দিয়েছিল মাত্র পাঁচ কার্যদিবস। কিন্তু পাঁচ মাসের বেশি সময় পার হলেও সেই তদন্তের প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি। ফলে আগের পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটির আদৌ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না, হলে তার পরিমাণ কত এবং এর দায় কার, এসব প্রশ্নের উত্তর অন্ধকারেই রয়ে গেছে।
বিদেশি উড়োজাহাজ কোম্পানির কাছে জ্বালানি বিক্রি করে পদ্মা অয়েল যে ডলার আয় করে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে গণমাধ্যমে। এরপর গত ২৭ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কিন্তু সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে জমা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভাগের উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কমিটির প্রধান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব ইরশাদ রেজা। সদস্য দুজন হলেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক (পরিকল্পনা) আসাদুল হক এবং বিভাগের উপসচিব (পরিকল্পনা শাখা-১) এস এম জাকারিয়া। বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে আসাদুল হক বলেন, আর্থিক বিষয়ের তদন্তে সময় লাগে। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই করতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, নিজের অংশের কাজ শেষ করে কমিটির প্রধানের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।
কমিটির প্রধান ইরশাদ রেজার বক্তব্য জানতে গত ৮ অক্টোবর যোগাযোগ করা হয়। তিনি তখন জানান, তিনি অসুস্থ। পরে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করে, প্রতিবেদন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জমা পড়েনি।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। সদস্যদের একজন বলছেন, তাঁর অংশের কাজ শেষ। অথচ প্রধানের কাছে জমা দেওয়া অংশগুলো একত্র করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আর সরকারের কাছে পৌঁছায়নি। যে কাজের সময়সীমা ছিল এক সপ্তাহ, তা পাঁচ মাসেও শেষ না হওয়া সরকারি তদন্ত ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
পুরো বিষয়টির শুরু যেভাবে, তা বুঝতে আগের পদ্ধতির দিকে তাকানো দরকার। পদ্মা অয়েল বিদেশি এয়ারলাইনসের কাছে উড়োজাহাজের জ্বালানি বিক্রি করে ডলারে অর্থ পায়। সেই ডলার টাকায় রূপান্তর করে তারা বিপিসিকে দিত। কিন্তু জ্বালানি তেল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে বিপিসির আবার ডলার দরকার হতো। তখন সংস্থাটিকে বাজার থেকে ডলার কিনতে হতো। ডলারকে টাকা বানানো এবং আবার টাকা দিয়ে ডলার কেনার এই চক্রে বিনিময় হারের পার্থক্য তৈরি হতো। ধারণা করা হয়, এতে প্রতি ডলারে সর্বোচ্চ দুই টাকা পর্যন্ত লোকসানের ঝুঁকি ছিল। এই অঙ্ক ছোট মনে হলেও আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় মোট ক্ষতির আশঙ্কা বড় হতে পারে।
পরে বিপিসির নির্দেশনায় পদ্মা অয়েল ও বিপিসি, দুটি প্রতিষ্ঠানই বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব (ফরেন-কারেন্সি অ্যাকাউন্ট) খোলে। উদ্দেশ্য ছিল ডলারকে বারবার টাকায় এবং টাকাকে ডলারে রূপান্তরের ঝামেলা এড়ানো। কর্মকর্তারা জানান, গত পাঁচ মাস ধরে উড়োজাহাজের জ্বালানি বিক্রির অর্থ সরাসরি পদ্মা অয়েলের হিসাবে জমা হচ্ছে। সেখান থেকে তা যাচ্ছে বিপিসির বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে। চলতি মাসে সেই অর্থ ব্যবহার করেই জ্বালানি তেল আমদানির এলসি খুলেছে বিপিসি। উড়োজাহাজের জ্বালানি বিক্রির বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে সরাসরি জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ এই প্রথম।
নতুন ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি সংশোধনী পদক্ষেপ। তবে সংশোধন হলেই অতীতের প্রশ্ন মিটে যায় না। আগের পদ্ধতিতে বাস্তবে কোনো ক্ষতি হয়েছিল কি না, হলে কত টাকার, সেটা এখনো অজানা। কার অনুমোদনে ওই পদ্ধতি চালু ছিল, তা প্রচলিত বিধিবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল কি না, তাও পরিষ্কার নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব খোলার মতো সহজ সমাধান কেন আগেই নেওয়া হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর মিলবে না।
এর মধ্যে পদ্মা অয়েলের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) কাঞ্চন চন্দ্র সোমের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর পদ্মা অয়েলের এক কর্মীর দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশন তদন্তে নেমেছে।
অভিযোগে নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকে অর্থ জমা, বিদেশ সফর, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারসহ নানা অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগকারী প্রশ্ন তুলেছেন, ২০০৯ সালে কাঞ্চন চন্দ্র সোমকে ব্যবস্থাপক (হিসাব) পদে নিয়োগের সময় বিপিসির নিয়োগবিধি মানা হয়েছিল কি না। তাঁর দেখানো পেশাগত অভিজ্ঞতার তথ্য নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর দাবি রয়েছে। বলা হয়েছে, কোম্পানির ৩০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে রাখা হয়েছিল। এর বড় একটি অংশ এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। আরও অভিযোগ, কোম্পানির আদায় করা অর্থ বছরের পর বছর তুলনামূলক কম সুদের স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট (এসএনডি) হিসাবে রাখা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
২০১৯ সালের একটি বিদেশ সফর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী। তাঁর দাবি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পূর্বানুমোদন ছাড়াই কাঞ্চন চন্দ্র সোম ছুটি নিয়ে ওই সফরে গিয়েছিলেন। পাশাপাশি উড়োজাহাজের জ্বালানি বিক্রির ডলার ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও অভিযোগের তালিকায় আছে। তবে এগুলো এখনো কেবল অভিযোগ। এসবের সত্যতা আছে কি না এবং কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক অনিয়ম হয়েছে কি না, তা দুদকের তদন্তেই নির্ধারিত হবে।
অভিযোগ ও তদন্তে বিলম্ব নিয়ে বক্তব্য জানতে পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমানের কাছে ইমেইল ও হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। পরে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বৈঠকে আছেন বলে ফোন রেখে দেন। কাঞ্চন চন্দ্র সোমের দাপ্তরিক ইমেইল ও হোয়াটসঅ্যাপেও প্রশ্ন পাঠানো হয়। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টায়ও তিনি সাড়া দেননি। প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত তাঁদের কারও কাছ থেকে জবাব মেলেনি।
সব মিলিয়ে চিত্রটি উদ্বেগজনক। একদিকে সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাঁচ মাসেও জমা পড়েনি, অন্যদিকে দুদক আলাদা করে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ আর্থিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখছে। দুটি তদন্তই একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে জড়িত। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে ডলারের মতো সংবেদনশীল সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রত্যাশিত। সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পরও যদি তদন্ত মাসের পর মাস ঝুলে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ওই সময়সীমা আদৌ কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল।
ডলারের সংকট ও বিনিময় হারের অস্থিরতার সময়ে প্রতিটি টাকার হিসাব জরুরি। তাই কেবল ভবিষ্যতের জন্য ব্যবস্থা বদলালেই চলবে না। অতীতের পদ্ধতিতে কোনো ক্ষতি হয়ে থাকলে তার পরিমাণ নির্ধারণ করা, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং প্রতিবেদন প্রকাশ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়া এবং দুদকের তদন্ত চলমান থাকায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর সুরাহা এখনো হয়নি।

