ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম আট মাসে জনপ্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দুই হাজারের বেশি কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন করেছে সরকার। একই সময়ে এক হাজার ৫৫ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন, বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন ৩২ জন, আর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সৃষ্টি হয়েছে ৫৮টি নতুন পদ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বুধবারের (১৪ অক্টোবর) বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে মাঠপর্যায় থেকে সচিবালয় পর্যন্ত প্রশাসনের প্রায় সব স্তরের পরিবর্তনের হিসাব দেওয়া হয়েছে। এক নজরে দেখলে এটি সরকারের প্রথম আট মাসের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সচিব ও সমপর্যায়ের পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ৭৪৬ জন। এর মধ্যে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে গেছেন ১৮ জন, গ্রেড-১ পদে ৯ জন, যুগ্মসচিব পদে ১৮০ জন, উপসচিব পদে ২৭৫ জন এবং সিনিয়র সহকারী সচিব পদে ২৬৪ জন। এ ছাড়া সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) মাধ্যমে অন্যান্য পদে পদোন্নতি পেয়েছেন আরও ৩০৯ জন। তাঁদের মধ্যে গ্রেড-১ পদে ১৭ জন, গ্রেড-২ পদে ৩৪ জন এবং গ্রেড-৩ পদে ২৫৮ জন। দুই ধারা মিলিয়ে মোট পদোন্নতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৫।
পদোন্নতির এই তালিকায় চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মকর্তা উঠেছেন মধ্যম স্তরের পদগুলোতে। উপসচিব ও যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন মোট ৪৫৫ জন। অর্থাৎ প্রশাসনের মধ্যম স্তর, যাঁরা নীতি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সামলান, তাঁদের কাঠামোতেই সবচেয়ে বেশি নড়াচড়া হয়েছে। অন্যদিকে শীর্ষ পর্যায়ে, অর্থাৎ সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন তুলনামূলক কম, ১৮ জন।
মাঠ প্রশাসনেও বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার থেকে সহকারী কমিশনার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ৫৮৯টি বদলি ও পদায়নের তথ্য আছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে ৬ জন বিভাগীয় কমিশনার, ৪ জন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, ৩৬ জন জেলা প্রশাসক ও ১০৯ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে বদলি হয়েছেন ৩০৮ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এ ছাড়া ৮২ জন সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও ৪৪ জন সহকারী কমিশনারও বদলির তালিকায় আছেন। মাঠ প্রশাসনের এই তালিকায় সবচেয়ে বড় অংশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের। সংখ্যাটি জানিয়ে দেয়, তৃণমূল পর্যায়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বেই সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব থেকে সহকারী সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নও হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব, ১০০ জন অতিরিক্ত সচিব, ১০৩ জন যুগ্মসচিব, ১৮২ জন উপসচিব, ২৭৪ জন সিনিয়র সহকারী সচিব এবং ৩৪ জন সহকারী সচিব। পাশাপাশি প্রেষণে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে ৫৭ জন অতিরিক্ত সচিব, ১১৫ জন যুগ্মসচিব, ২০৫ জন উপসচিব, ১৮২ জন সিনিয়র সহকারী সচিব এবং অন্যান্য পর্যায়ের ১৪৪ জন কর্মকর্তাকে। মাঠ প্রশাসন, মন্ত্রণালয় ও প্রেষণে পদায়নের এই তিন ধারার সংখ্যা যোগ করলে মোট বদলি-পদায়নের পরিমাণ দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়।
প্রশাসনের কাঠামো সম্প্রসারণের ইঙ্গিতও মিলেছে প্রতিবেদনে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে মোট ৫৮টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মধ্যে সচিব পদে ২টি, অতিরিক্ত সচিব পদে ৭টি, যুগ্মসচিব পদে ৮টি এবং উপসচিব পদে ১৪টি। সিনিয়র সহকারী সচিব ও সহকারী সচিব পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে ১৯টি পদ। এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে ১টি এবং ভূমিসংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার পদে ৭টি নতুন পদ যুক্ত হয়েছে। নতুন পদ সৃষ্টির অর্থ সাধারণত কাজের পরিধি বা দায়িত্ব বাড়ানো। তবে কোন কোন দপ্তরের জন্য কেন এসব পদ প্রয়োজন হলো, প্রতিবেদনে তার ব্যাখ্যা নেই।
অবসরের তথ্যও আছে প্রতিবেদনে। নথি অনুযায়ী, অতিরিক্ত সচিব ও তার ঊর্ধ্ব পর্যায়ের ৫৯ জন, যুগ্মসচিব ও উপসচিব পর্যায়ের ২৫ জন এবং সহকারী ও সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়ের ৩৬ জনকে অবসর দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ৩২ জন কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসরে। প্রশাসনের ওপরের স্তরে অবসরের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেখানে শূন্য পদ তৈরি হয়েছে। সেসব পদ পূরণে পদোন্নতি ও বদলির প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলেছে বলে ধারণা করা যায়।
নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের কাজও চলছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৪৫তম, ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের প্রাক্-চাকরি যাচাই কার্যক্রম চলমান। এই তিন বিসিএসে সুপারিশ পেয়েছেন যথাক্রমে এক হাজার ৮০৬ জন, এক হাজার ৪৫১ জন ও এক হাজার ৩৩৪ জন প্রার্থী। অর্থাৎ যাচাই-বাছাই শেষে নিয়োগ পেলে প্রশাসনে বিপুল সংখ্যক নতুন মুখ যুক্ত হবে। এর বাইরে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে ২৭তম ও ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের কয়েকটি ধাপে মোট এক হাজার ১০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের বাইরে প্রশাসনিক সংস্কার ও সক্ষমতা বাড়ানোর কিছু উদ্যোগের কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে আছে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কর্মজীবন পরিকল্পনা তৈরি, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক নিয়োগ এবং সরকারি যানবাহন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা ২০২৬ প্রণয়ন। মুদ্রণ ও প্রকাশনাসংক্রান্ত সংশোধিত নীতিমালা তৈরি এবং বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড আইন সংশোধনের কাজও চলছে।
পেনশন ব্যবস্থায় ডিজিটাল সেবার বিষয়টিও প্রতিবেদনে এসেছে। অনলাইনে পেনশন নিষ্পত্তির জন্য ‘অনলাইন পেনশন ট্র্যাকিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (ওপিটিএমএস) চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে অবসরে যাওয়া কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমার সম্ভাবনা আছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের কল্যাণসেবা সহজ করা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কার্যক্রমের কথাও বলা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে, আট মাসে প্রশাসনের প্রায় সব স্তরেই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এত বড় পরিসরে বদলি ও পদোন্নতি প্রশাসনে নতুন নেতৃত্ব ও গতি আনতে পারে, এমন প্রত্যাশা থাকে। তবে বারবার বদলির ফলে কর্মকর্তারা নতুন কর্মস্থলের কাজ বুঝে উঠতে সময় নেন। সে ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা কিছুটা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এসব পরিবর্তন সেবার মান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিতে বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন দেওয়া হয়নি।

