দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আগামী নভেম্বরের মধ্যে এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক ভৌত পরীক্ষা ও চুল্লির পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতিসংক্রান্ত পরীক্ষা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট চালুর প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, জাতীয় সংসদ ভবনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে প্রকল্পটির অগ্রগতি ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি স্থাপন এবং চুল্লি চালুর প্রক্রিয়া আগামী বছরের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন তাঁরা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে কাজ চলছে। এখন উৎপাদন শুরুর আগে বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শুধু যন্ত্রপাতি সচল করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি ব্যবস্থা নির্ধারিত নিরাপত্তা ও পরিচালন মান পূরণ করছে কি না, তা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
প্রাথমিক ভৌত পরীক্ষা এবং চুল্লির পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতিসংক্রান্ত পরীক্ষা এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়। পরবর্তী ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পথে আরও অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ শুরু করা শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফলাফল, নিরাপত্তা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপর নির্ভর করবে।
বৈঠকে রূপপুর কেন্দ্রকে তৃতীয় প্রজন্মের আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে বলেও জানানো হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নেও প্রকল্পটি সঠিক পথে রয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছে।
রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় নতুন একটি উৎস যুক্ত হবে। জ্বালানির বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনায়ও এ কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে উৎপাদন কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে চালু রাখা যায়, বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয় এবং কেন্দ্র পরিচালনায় নিরাপত্তা ও দক্ষতা কতটা বজায় থাকে তার ওপর।
এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ইউনিটের অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বছরের জুনের মধ্যে ওই ইউনিটে জ্বালানি স্থাপন ও চুল্লি চালুর প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে ভবিষ্যতে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে নির্ধারিত সময়সীমা বাস্তবায়নে কারিগরি প্রস্তুতি, নিরাপত্তা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে বৈঠকে শুধু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্রগতিই নয়, অন্যান্য উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়। স্বাস্থ্য খাতে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সুবিধা জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ এবং দেশের প্রথম গবেষণা জাহাজ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়। এসব উদ্যোগ চিকিৎসা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনচর্চা বাড়াতে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে বিজ্ঞান মেলা আয়োজনের সুপারিশ করেছে স্থায়ী কমিটি। পাশাপাশি দেশীয় উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
বৈঠকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
সব মিলিয়ে, নভেম্বরের মধ্যে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য প্রকল্পটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় বিষয়। নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে রূপপুরের অবদান রাখার পথ আরও সুগম হবে।

