রাজধানীর যানজট নিরসন ও গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পে নতুন ধাপ শুরু হতে যাচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণাধীন মেট্রোরেলের চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন এলাকায় চলতি অক্টোবরেই ভূগর্ভস্থ পরিষেবা লাইন স্থানান্তরের কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির নির্মাণ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম লাইনের আওতায় কমলাপুর, রাজারবাগ, মালিবাগ ও রামপুরা স্টেশন এলাকায় এ কাজ শুরু হবে। প্রকল্পের তৃতীয় চুক্তি প্যাকেজের অধীনে এসব এলাকার বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন পরিষেবা অবকাঠামো প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানান্তর করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. সারওয়ার উদ্দিন খান জানিয়েছেন, চতুর্থ চুক্তি প্যাকেজের আওতায় নতুনবাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা ও আফতাবনগর পাতাল স্টেশন এলাকায় পরিষেবা লাইন স্থানান্তরের কাজ ইতোমধ্যে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এর মধ্যে উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা ও আফতাবনগরে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়।
অন্যদিকে বিমানবন্দর, তৃতীয় টার্মিনাল ও খিলক্ষেত স্টেশন এলাকায় ষষ্ঠ চুক্তি প্যাকেজ এবং নর্দ্দা স্টেশন এলাকায় পঞ্চম চুক্তি প্যাকেজের আওতাধীন পরিষেবা স্থানান্তরের কাজ শেষ হয়েছে। ফলে প্রকল্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে মূল নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি আরও জোরদার হয়েছে।
দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল প্রকল্পটি মোট ১২টি চুক্তি প্যাকেজের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে প্রকল্পের উভয় পথের বিস্তারিত সমীক্ষা, জরিপ এবং প্রাথমিক ও চূড়ান্ত নকশা প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় ১২টি পাতাল স্টেশনের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন পরিষেবা লাইন একটি সমন্বিত ভূগর্ভস্থ করিডরে স্থানান্তরের কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার ইউনিট।
এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো নির্মাণস্থলে বিদ্যমান পরিষেবা অবকাঠামোর জটিলতা কমানো এবং ভবিষ্যতে মেট্রোরেলের মূল নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা প্রস্তুত করা। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার পরিষেবা লাইন পরিকল্পিতভাবে বিন্যস্ত করা গেলে পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারকাজও তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
তবে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে এ ধরনের কাজ বাস্তবায়ন সহজ নয়। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়কের নিচে থাকা পরিষেবা লাইন সরানোর সময় যান চলাচল ও জনজীবনে সাময়িক বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে নির্মাণ এলাকার যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিষেবা লাইন স্থানান্তরের কাজ ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কিছু কার্যক্রম আগামী বছরের অক্টোবর কিংবা নভেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, পাতাল মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিদ্যমান পরিষেবা অবকাঠামো স্থানান্তর, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং যানবাহন চলাচল সচল রেখে নির্মাণকাজ পরিচালনা করা প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
অবশিষ্ট স্টেশনগুলোর পরিষেবা স্থানান্তর মূল নির্মাণ প্যাকেজের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও চলমান।
প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পে দুটি আন্তসংযুক্ত পথ থাকছে। এর মধ্যে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথটি সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ হবে। এ পথে মোট ১২টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে থাকবে নয়টি স্টেশন। এর মধ্যে সাতটি উড়ালপথে এবং দুটি ভূগর্ভে নির্মিত হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং পূর্বাচলের মধ্যে গণপরিবহন যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনের মধ্যে সরাসরি মেট্রো যোগাযোগ চালু হলে যাত্রীদের যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন জমি ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পের পাশাপাশি প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেলের পঞ্চম লাইনের উত্তরাংশের সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করেছে। উভয় প্রকল্পেই অর্থায়ন সহযোগী হিসেবে রয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা।
প্রকল্পের প্রথম চুক্তি প্যাকেজের আওতায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পিতলগঞ্জ মৌজায় ৩৫ দশমিক ৯০ হেক্টর বা ৮৮ দশমিক ৭১ একর জমিতে মেট্রোরেলের ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০২৩ সালের ১ মার্চ শুরু হওয়া এ কাজ সম্পন্ন হয় ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট।
রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা মোকাবিলায় পাতাল মেট্রোরেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে ভূগর্ভে অধিকসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হলে নগর পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে।
তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করলেই প্রত্যাশিত সুফল নিশ্চিত হবে না। স্টেশনগুলোর সঙ্গে আশপাশের সড়ক, বাসসেবা ও অন্যান্য গণপরিবহনের কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের সময় জনদুর্ভোগ কমানো এবং প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে কমলাপুর, রাজারবাগ, মালিবাগ ও রামপুরায় নতুন করে পরিষেবা লাইন স্থানান্তরের উদ্যোগ দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে পরিকল্পিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে রাজধানীবাসীকে এর সুবিধা দিতে পারাই হবে প্রকল্পটির বড় পরীক্ষা।

