নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা বারবার ঘোষণা করেও তা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। এর প্রতিফলন দেখা গেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) এনার্জি ট্রানজিশন ইনডেক্স ২০২৬-এ। জ্বালানি রূপান্তরে ১২০টি দেশের এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে।
একসময় দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় গ্রিডের বিদ্যুৎ ছিল না। তখন প্রায় ৬৫ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে দরিদ্র ও প্রান্তিক অনেক পরিবারে আলো পৌঁছেছিল। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জ্বালানি রূপান্তরের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে এই কর্মসূচি দেশে-বিদেশে প্রশংসা পায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সৌরসহ নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার সে গতিতে বিস্তৃত করা যায়নি।
বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলো জ্বালানি রূপান্তরে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রয়োজনেও এই রূপান্তর বহু বছর ধরে বিশ্বজুড়ে আলোচিত। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সপ্তম লক্ষ্য হলো সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডব্লিউইএফ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি খাতের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ ও তুলনা করে আসছে। এবার ৪৪টি সূচক ব্যবহার করে ১২০টি দেশের বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। কোনো দেশের স্কোর নির্ধারণ হয়েছে দুটি উপসূচকের সমন্বয়ে। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যবস্থার কার্যকারিতার গুরুত্ব ৬০ শতাংশ এবং রূপান্তরের প্রস্তুতির গুরুত্ব ৪০ শতাংশ।
প্রথম উপসূচক সিস্টেম পারফরম্যান্স। এতে দেখা হয় বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থা কেমন চলছে। মূল্যায়নের তিন ক্ষেত্র হলো জ্বালানির নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী প্রাপ্যতা ও ন্যায্যতা এবং টেকসইতা। মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ৬৩ দশমিক ৩। দ্বিতীয় উপসূচক ট্রানজিশন রেডিনেস, অর্থাৎ ভবিষ্যতে রূপান্তর এগিয়ে নিতে কোন দেশ কতটা প্রস্তুত। এতে বিবেচনায় নেওয়া হয় পাঁচটি বিষয়: নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো, উদ্ভাবন এবং শিক্ষা ও মানবসম্পদ। এখানে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ৩০ দশমিক ৫।
দুই স্কোরের ব্যবধানই বলে দেয়, সমস্যাটা কোথায়। বর্তমান ব্যবস্থার কার্যকারিতায় বাংলাদেশ মোটামুটি অবস্থানে থাকলেও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতিতে অনেক পিছিয়ে। জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রস্তুতির স্কোর কম হওয়ার মূল কারণ নবায়নযোগ্য খাতে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেও তা পূরণ করতে না পারা। অর্থায়ন, জমি অধিগ্রহণ ও প্রযুক্তিসহ নানা বিষয়ে অতীতে যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার মূল কারণ ট্রানজিশন রেডিনেসে এগোতে না পারা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা, যা আর্থিক বা কারিগরি নানা কারণে হতে পারে। তাঁর মতে, সরকারের নেওয়া কর্মসূচি সময়মতো বাস্তবায়ন ও তদারকি করতে হবে। প্রস্তুতির বড় একটি ক্ষেত্র হলো গ্রিড আধুনিকায়ন। তিনি জানান, সরকার এখন নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, যা আগে ছিল না। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে আগে উচ্চ শুল্ক ছিল, এখন ছয় মাসের জন্য তা এক শতাংশে নামানো হয়েছে। তবে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো দরকার বলে তিনি মনে করেন।
অতীতের চিত্র ভালো নয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার নবায়নযোগ্য খাত এগিয়ে নিতে নানা উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার ৫ শতাংশ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য। কিন্তু সে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালা, রোডম্যাপ, সরকারি-বেসরকারি সহায়তা, প্রণোদনা ও প্রযুক্তির নানা সংকট ছিল। এ ছাড়া জমির স্বল্পতা এবং কুইক রেন্টাল ও কয়লাবিদ্যুৎকে প্রাধান্য দেওয়াও পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
২০২৪ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকার বিশেষ আইনের অধীনে আগের আমলে অনুমোদিত ৩১টি নবায়নযোগ্য ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে। খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকের মতে, এ সিদ্ধান্তও বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার বড় কারণ। তাঁদের ভাষ্য, প্রকল্পগুলো বাতিল না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আসত এবং অনেক কেন্দ্র এত দিনে উৎপাদনে চলে আসত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সরকার যে সংকটে পড়েছে, তাও কিছুটা সহনীয় থাকত বলে তাঁরা মনে করেন।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বর্তমান সক্ষমতা ১ হাজার ৮১৬ মেগাওয়াট। এর ৮৩ শতাংশই সৌরবিদ্যুৎ, অর্থাৎ ১ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের হিস্যা ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। সৌরবিদ্যুতের বাইরে বায়ুবিদ্যুতের উল্লেখযোগ্য কোনো অংশগ্রহণ নেই। জলবিদ্যুতের সক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট, সেটিও অনেক পুরোনো।
বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য খাতে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের শুল্ক এক শতাংশে নামানো হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন হারে কর রেয়াত দেওয়ার উদ্যোগও আছে। তবে ছয় মাস পর শুল্কহার কত হবে, তা পরিষ্কার নয়। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে এসব বিষয় আরও অনুমানযোগ্য ও অনুকূল হওয়া জরুরি।
বেসরকারি খাতও এগিয়ে এসেছে। ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, বিস্তৃত আকারে কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের দায়িত্ব সৌর প্রকল্প এলাকা পর্যন্ত সাবস্টেশন ও ট্রান্সমিশন লাইন তৈরি করে দেওয়া, শুল্ক নির্ধারণ করে দেওয়া এবং জমি-সংক্রান্ত বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি করা। তাঁর প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে এবং সোলার প্যানেল তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে।
স্রেডার সাবেক চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন বলেন, বর্তমান উদ্যোগে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। বেসরকারি খাত প্রস্তুত কি না এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত দক্ষতা আছে কি না, তা বিবেচনার বিষয়। তিনি জানান, এখন বছরভিত্তিক পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং কোন খাত থেকে কতটুকু পরিচ্ছন্ন জ্বালানি আসবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্রেডার বর্তমান চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ বলেন, নবায়নযোগ্য খাতে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এখন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ। সরকার ইতিমধ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬–২০৩০) তৈরি করেছে। এতে ১৬ থেকে ১৭টি প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি স্বীকার করেন, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এ খাতে অনেক এগিয়ে গেছে, বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে।
জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন কর্মসূচির প্রধান আবুল কালাম আজাদ বলেন, জ্বালানি রূপান্তর যে জরুরি, তা তাঁরা বহুবার বলে আসছেন। বৈশ্বিক পরিস্থিতি হয়তো ভবিষ্যতে স্থিতিশীল হবে, জ্বালানিও সহজলভ্য হবে, কিন্তু দাম কমবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। তাঁর মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে আর নবায়নযোগ্য খাতকে আড়ালে রাখা হয়েছে। এখন সংকট প্রকট হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্ট। ঘোষণা ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ঘাটতি নেই, ঘাটতি বাস্তবায়নে। ১ হাজার ৮১৬ মেগাওয়াট থেকে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে চার বছরের মধ্যে সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়াতে হবে। এ জন্য গ্রিড আধুনিকায়ন, জমি পাওয়া, অর্থায়ন ও দক্ষ জনবল একসঙ্গে নিশ্চিত করা দরকার। শুল্কছাড়ের মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়তে পারেন। আবার বাতিল হওয়া প্রকল্প নিয়ে বিতর্কও বিনিয়োগ-পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে প্রকাশিত তথ্যে কিছু বিষয় স্পষ্ট নয়। বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রার বিস্তারিত অঙ্ক, এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ এবং শুল্কছাড়ের মেয়াদ শেষে কী হবে, তা জানানো হয়নি। গ্রিড আধুনিকায়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমাও উল্লেখ নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে বোঝা যাবে, ২০৩০ সালের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত।

