সৌদি আরবে ফিরতে চাওয়া বাংলাদেশি প্রবাসীরা এখন বাধ্য হয়ে ভিন্ন রুট বেছে নিচ্ছেন। রিয়াদ ও দাম্মামের ফ্লাইট বাতিল থাকায় তাঁরা মদিনা হয়ে যাচ্ছেন। এতে একদিকে বাড়তি খরচ, অন্যদিকে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার ধকল পোহাতে হচ্ছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় অনেকের হাতে বিকল্প নেই। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
গত ১০ অক্টোবর রিয়াদ বিমানবন্দর হুথিদের হামলার শিকার হয়। এরপর দাম্মাম বিমানবন্দরেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এর ফলে ওই দুই বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার (১৪ অক্টোবর) পর্যন্ত ১০০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ১৫ হাজারের বেশি প্রবাসী আটকা পড়েছেন।
নোয়াখালী সদরের মামুন রিয়াদে একটি কোম্পানির লরিচালক। পাঁচ বছরের প্রবাসজীবনে প্রথমবার দেশে এসেছিলেন দুই মাস আগে। ১১ অক্টোবর তাঁর রিয়াদে ফেরার ফ্লাইট ছিল, কিন্তু তা বাতিল হয়ে যায়। ১২ অক্টোবরের জন্য নতুন টিকিট কেটেছিলেন, সেই ফ্লাইটও বাতিল হয়। ভিসার মেয়াদ বাকি ছিল মাত্র পাঁচ দিন। শেষ পর্যন্ত আজ মদিনার ফ্লাইটের টিকিট পান তিনি। যুদ্ধের আতঙ্ক থাকলেও যেতে পারছেন, এতেই স্বস্তি তাঁর। মামুন বলেন, মদিনা থেকে রিয়াদ যেতে বাসে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লাগবে। সেখানেও হয়রানি ও খরচ আছে। তবু যেতেই হবে বলে অতিরিক্ত টাকা ও ঝুঁকি মেনেই রওনা হয়েছেন।
মানিকগঞ্জের পারভেজের ভিসার মেয়াদ আছে প্রায় সাত দিন। তিনি জানান, একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় মনে হচ্ছিল আর যাওয়াই হবে না। আবার সমস্যা হতে পারে, এই আশঙ্কায় এখনই রওনা হচ্ছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আলামিন বলেন, রিয়াদ ও দাম্মামের সব ফ্লাইট বাতিল, কবে চালু হবে কেউ জানে না। ভিসার মেয়াদও শেষ। তাই বাধ্য হয়ে মদিনা হয়ে যাচ্ছেন। সরাসরি ফ্লাইট থাকলে এ ঝামেলা হতো না বলে তাঁর ক্ষোভ।
বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষের পথে, মূলত তাঁরাই টিকিট পরিবর্তন করে মদিনা হয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ বিমানের মদিনার ফ্লাইটটি বিকেল ৩টা ৫৫ মিনিটে। তাই যাত্রীরা দুপুর ১২টার মধ্যেই বিমানবন্দরে পৌঁছান। ফ্লাইট ছাড়ার নিশ্চয়তা পেয়ে তাঁদের মুখের দুশ্চিন্তা কেটে হাসি ফুটতে দেখা গেছে।
যাত্রীরা জানান, গ্রাম থেকে বারবার এসে টিকিট পরিবর্তন করা এবং মদিনা থেকে রিয়াদ যাওয়ার খরচ মিলিয়ে তাঁদের বাড়তি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা লাগছে। তবু ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার চেয়ে এই খরচ মেনে নেওয়াই তাঁদের কাছে শ্রেয়।
এ ঘটনা প্রবাসী শ্রমিকদের অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরেছে। বিদেশে কাজের ভিসার মেয়াদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরার শর্তে সীমাবদ্ধ থাকে। সে সময়ের মধ্যে ফিরতে না পারলে চাকরি হারানোসহ আইনি জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হয়। অথচ যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বন্ধ থাকাটা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার খরচও কম নয়। বিশেষ করে অনেকের মাসিক আয় যেখানে সীমিত, সেখানে এ অঙ্ক বড় বোঝা।
তবে মদিনা থেকে রিয়াদ পর্যন্ত বাস্তায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টার যাত্রা কতটা নিরাপদ, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। যাত্রীদের কেউ কেউ নিজেরাই ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে সরকার বা বিমান কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য প্রকাশিত তথ্যে নেই। রিয়াদ ও দাম্মামের ফ্লাইট কবে স্বাভাবিক হবে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া প্রবাসীদের জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে আটকে পড়া প্রবাসীদের অনিশ্চয়তা কিছুটা কমতে পারে।

