কীর্তিনাশা নদীর ওপর দুটি নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। কিন্তু আজও তা শেষ হয়নি। গত দুই বছর ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ। এর মধ্যে পাশের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দুটি দিয়েই চলছে শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় যাওয়ার যান চলাচল। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ঠিকাদার এখন চতুর্থবারের মতো সময় বাড়ানোর পাশাপাশি বাড়তি টাকাও চেয়েছেন।
সেতু দুটির একটি শরীয়তপুর সদর উপজেলার প্রেমতলায়। অন্যটি সেখান থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে জাজিরা উপজেলার কাজীরহাটে। দুটিই কীর্তিনাশা নদীর ওপর নির্মাণাধীন। শরীয়তপুর শহর থেকে জাজিরার নাওডোবা পর্যন্ত আঞ্চলিক সড়কটির দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার। একসময় এই সড়ক ধরে মানুষ পদ্মার জাজিরা প্রান্তের ঘাটে গিয়ে নদী পার হয়ে ঢাকায় যেতেন। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর সড়কটিতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। ফলে পুরোনো সেতু দুটির গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই সড়ক ও সেতু দিয়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০টি যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে আড়াই শতাধিক যাত্রীবাহী বাস।

পুরোনো সেতু দুটি তৈরি হয়েছিল ১৯৯১ সালে। নির্মাণ করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রেমতলার সেতুটি ১১০ মিটার লম্বা ও ৩ মিটার চওড়া। কাজীরহাটের সেতুটি ৫০ মিটার লম্বা ও একই প্রস্থের। ৩৫ বছর ব্যবহারের পর এখন দুটিই জরাজীর্ণ। বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে। কোথাও কোথাও মেঝে ও রেলিং থেকে রড বেরিয়ে এসেছে। সেতু দুটি এত সরু যে একদিক থেকে যানবাহন উঠলে উল্টো দিকের যানবাহন উঠতে পারে না। ফলে প্রায়ই দুই পাশে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়ে যানজট লেগে যায়।
এই যানজটের চিত্র পাওয়া গেছে যাত্রী ও চালকদের কথায়। ঢাকা–শরীয়তপুর সড়কে চলাচলকারী শরীয়তপুর সুপার সার্ভিসের চালক লোকমান হোসেন প্রতিদিন একবার ঢাকায় যান, আবার ফিরে আসেন। তিনি জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় শরীয়তপুর থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী পৌঁছাতে দেড় ঘণ্টা লাগার কথা। কিন্তু এখন লাগছে প্রায় দুই ঘণ্টা। কারণ, কাজীরহাটে ২০ থেকে ২৫ মিনিট যানজটে আটকে থাকতে হয়। এতে যাত্রীরা বিরক্ত হন।
গোসাইরহাট সদরের ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন সপ্তাহে দুই দিন ব্যবসার কাজে ঢাকায় যান। গত মঙ্গলবার তিনি যে বাসে যাচ্ছিলেন, সেটিও কাজীরহাট বাজারে জটে আটকা পড়ে। তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে উঠলে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে জাজিরার নাওডোবায় পৌঁছানো যায়। তবে কাজীরহাটের পুরোনো সেতুর কাছে যানজটে বাড়তি ২৫ থেকে ৩০ মিনিট চলে যায়। তাঁর ভাষ্য, প্রেমতলা সেতু এলাকায় সাধারণত যানজট হয় না।
নতুন সেতু দুটি নির্মাণের পরিকল্পনা এসেছিল একটি বড় প্রকল্পের অংশ হিসেবে। শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের নাওডোবা পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে ২০২০ সালে ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। এর আওতায় সওজ প্রেমতলায় ১৯০ মিটার লম্বা ও কাজীরহাটে ১৫০ মিটার লম্বা দুটি সেতু বানানোর উদ্যোগ নেয়। দুটিরই প্রস্থ ১০ দশমিক ৩ মিটার। সেতু দুটির জন্য ব্যয় ধরা হয় ৫৮ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ১ এপ্রিল জামিল ইকবাল লিমিটেড ও মোজাহারুল এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে কার্যাদেশ পায়। কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। কিন্তু সময়মতো তা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত কাজীরহাট সেতুর প্রায় ৬০ শতাংশ এবং প্রেমতলা সেতুর প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এরপর থেকে দুই বছর কাজ বন্ধ আছে। এর মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা তিনবার বাড়ানো হয়েছে। চতুর্থবার সময় বাড়াতে আবেদন করেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।
গত মঙ্গলবার দুই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কাজীরহাটের সেতুর কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নদীর মধ্যে সেতুর কিছু অংশ তৈরি হলেও বাকি কাজ এগোয়নি। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী নির্মাণসামগ্রী পাহারা দিচ্ছেন। প্রেমতলা সেতুর মূল কাঠামোর বেশির ভাগ কাজ শেষ। তবে সেতুতে ওঠার সংযোগ সড়ক, রেলিং ও বিভিন্ন সার্ভিস লাইনের কাজ এখনো বাকি।
সওজ সূত্র জানিয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ–সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। পরে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়া ও অতিরিক্ত কাজের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে ঠিকাদার চুক্তিমূল্যের বাইরে আরও ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা চেয়ে আবেদন করেছে। ৫৮ কোটি টাকার চুক্তির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ৪৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার বিল তুলে নিয়েছে।
যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী কিংশুক মণ্ডল বলেন, তাঁরা কাজটি পেয়েছিলেন করোনার সময়ে। শুরু করতেই কিছুটা দেরি হয়। এরপর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। সেতু দুটিতে কিছু বাড়তি কাজও করতে হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক দফায় নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। এসব কারণেই ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সওজের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে বাকি কাজ শেষ করে সেতু দুটি সওজের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সওজের শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মনোয়ারুল ইসলাম জানান, কাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব ঢাকায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য, যত দ্রুত সম্ভব সেতু দুটির কাজ শেষ করে ব্যবহার উপযোগী করার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। ঠিকাদার ইতিমধ্যে চুক্তির প্রায় ৭৭ শতাংশ অর্থ তুলে নিয়েছেন। অথচ একটি সেতুর প্রায় ৪০ শতাংশ এবং অন্যটির প্রায় ২০ শতাংশ কাজ বাকি। সময়সীমা তিনবার পেরিয়ে গেছে, আর নতুন করে বাড়তি অর্থ চাওয়া হচ্ছে। এই অবস্থায় বিলম্বের দায় কার, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণসামগ্রীর দাম ও রাজনৈতিক অস্থিরতার যেসব কারণ দেখানো হচ্ছে, তার কতটা যৌক্তিক, তা যাচাইয়ের দাবিও জোরালো হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৫ বছরের পুরোনো সরু দুটি সেতুর ওপর দিয়েই প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন।

