দেশে প্রতি ৮৬৮ জন নাগরিকের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন পুলিশ সদস্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা অনেক কম বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এই ঘাটতি কমাতে বিভিন্ন পদমর্যাদা ও ইউনিটে নতুন করে ২৪ হাজার ৬৭৭টি পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি ৬ লাখ। এই জনসংখ্যার জন্য আনুমানিক ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১২৩ জন পুলিশ সদস্য প্রয়োজন। কিন্তু পুলিশের অনুমোদিত পদ আছে ২ লাখ ৭ হাজার ৯৩৮টি। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় ঘাটতি ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৮৫টি পদের। নন-পুলিশ পদ ধরলে মোট অনুমোদিত পদ ২ লাখ ১৮ হাজার ৭৪৭টি।
তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরেছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বে সাধারণত প্রতি ৪০০ জন মানুষের জন্য একজন পুলিশ থাকার মানদণ্ড প্রচলিত। মালয়েশিয়ায় প্রতি ২৯৭ জনে এবং থাইল্যান্ডে প্রতি ৩১৩ জনে একজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। সেখানে বাংলাদেশে এই অনুপাত ৮৬৮ জনে একজন, যা মানদণ্ডের দ্বিগুণেরও বেশি।
জনবলসংকট কাটাতে একাধিক প্রস্তাব এখন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে আছে। ১০ হাজার কনস্টেবল ও ৪ হাজার উপপরিদর্শকের (এসআই) পদ সৃষ্টির প্রস্তাব সচিব কমিটিতে পাঠাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। সার্জেন্টের ৪০০টি এবং সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) ৪৫০টি পদের প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়। এ ছাড়া থানা, তদন্তকেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি, ক্যাম্প ও অন্যান্য ইউনিটের জন্য বিভিন্ন পদমর্যাদায় আরও ৯ হাজার ৯৪৩টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজস্ব খাতে মোট ২৪ হাজার ৬৭৭টি পদের এই প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগে প্রক্রিয়াধীন। পাশাপাশি সারা দেশে নতুন করে ১০৭টি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
কমিটির বৈঠকে অপরাধ দমনের চিত্রও উঠে এসেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৫৫৭টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয়ভাবে তৈরি ৬৭২টি অস্ত্র, ৪ হাজার ৫৭৬টি গুলি ও ৪৫৫টি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। মাসওয়ারি হিসাবে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার বেড়েছে। জুলাইয়ে উদ্ধার হয় ১২০টি, আগস্টে ১৮৬টি এবং সেপ্টেম্বরে ২৫১টি। দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয় জুলাইয়ে ১৬৩টি, আগস্টে ২৫৫টি ও সেপ্টেম্বরে ২৫৪টি। এসব ঘটনায় ৪৫৫টি মামলা হয়েছে এবং ৬৯৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ২৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অভিযান জোরদার করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তারের তথ্যও দিয়েছে পুলিশ। অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পরিকল্পনা বা কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৯ হাজার ৭৩ জন। চোরাচালান ও মাদক ব্যবসার সন্দেহে ৩০ হাজার ১৮৭ জন, ছিনতাই, ডাকাতি ও দস্যুতার অভিযোগে ৩ হাজার ৪৪৫ জন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সন্দেহে ৪০ জন এবং চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সন্দেহে ৭৯৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
বিভিন্ন আইনে করা মামলার চিত্রও উপস্থাপন করা হয়েছে। দ্রুত বিচার আইনে ১৯৪টি মামলায় ২২২ জন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৪০৭টি মামলায় ৩ হাজার ৭০১ জন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৩৯৯টি মামলায় ৩৮৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৯৭২টি মামলায় ১ হাজার ৩৯০ জন, অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ৩৮টি মামলায় ৭৬ জন এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ৩৩৭টি মামলায় ২৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থার তথ্যও আছে, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এএসপি ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৪৭ জন কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের আওতাভুক্ত মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এএসপি ও তদূর্ধ্ব পদের ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে পাঁচজন চাকরিচ্যুত হয়েছেন। বাকি আটজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আশপাশে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বা আত্মগোপনে যাওয়ার অভিযোগে এএসপি ও তদূর্ধ্ব পদের আরও ৫৭ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২৮ জন চাকরি হারিয়েছেন এবং একজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি, সিআর ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আরও ২৯ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে ডিআইজি পদমর্যাদার দুজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ পরিদর্শকদের ক্ষেত্রে পাঁচজনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে এবং আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম চলছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ৭৩ জন পরিদর্শককে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (পুলিশ) ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তাঁদের ৩১ জন চাকরি হারিয়েছেন, বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চলছে।
সব মিলিয়ে পুলিশ বাহিনী একই সঙ্গে দুই চাপে আছে। একদিকে জনবলের বড় ঘাটতি, অন্যদিকে অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চোরাচালান দমন এবং নানা অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযানের বাড়তি দায়িত্ব। এর ওপর শত শত কর্মকর্তা বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর বা বিভাগীয় কার্যক্রমের মুখে পড়ায় অভিজ্ঞ জনবলের সংকট আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা যায়।
২৪ হাজার ৬৭৭টি পদের প্রস্তাব অনুমোদন পেলেও ঘাটতির তুলনায় তা সীমিত। বর্তমান ঘাটতি ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৮৫টি পদের, সেখানে নতুন পদ আসছে প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। অর্থাৎ মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো অনুপাতে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ বাকি। এ ছাড়া প্রস্তাবটি তিনটি দপ্তরে প্রক্রিয়াধীন থাকায় অনুমোদন ও নিয়োগে কত সময় লাগবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। এখন নজর থাকবে প্রস্তাবগুলো কত দ্রুত সচিব কমিটি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের অনুমোদন পায় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া কবে শুরু হয়, তার দিকে।

