উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো এখন আর আগের মতো খরস্রোতা নেই। শুষ্ক মৌসুমে একসময় প্রমত্ত থাকা ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, গঙ্গাধর ও জিঞ্জিরামের বুকে এখন ধু ধু বালু আর পলি। প্রতিবছরই এসব নদীতে জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষ সেই চরেই নতুন করে ঘর বাঁধছেন, ফসল ফলাচ্ছেন, গড়ে তুলছেন বাজার ও অর্থনীতি। তবে এই বসতি যেমন আশার, তেমনি অনিশ্চয়তারও। কারণ, যে চর বর্ষার পর জেগে ওঠে, এক রাতেই তা আবার নদীতে বিলীন হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেশে চরের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০। এসব চরে ভূমির পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর, যা দেশের মোট ভূমির প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে বোর্ডের চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট জরিপে এ তথ্য উঠে আসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়মিত নদী খনন বা ড্রেজিংয়ের ঘাটতি এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধার কারণে এই প্রবণতা বাড়ছে।

এক সময় চরকে মানুষ বিরান ভূমি হিসেবে দেখত। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। গৃহহীন ও ভাঙনে নিঃস্ব মানুষের বসতি চরের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। মাছ শিকারের পাশাপাশি চরের বাসিন্দারা কৃষি ও পশুপালনকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এতে তাঁদের খাদ্যনিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হচ্ছে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও তাঁরা ভূমিকা রাখছেন।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় চার বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠে মানুষমারার চর। ভাঙনে বসতভিটা ও আবাদি জমি হারানো বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৫০০ পরিবার সেখানে বসতি গড়েছে। ব্রহ্মপুত্রের বয়ে আনা পলিতে তাঁরা সব ধরনের ফসল ফলাচ্ছেন। এই চরের বাসিন্দা সত্তর বছর বয়সী কৃষক নজু মিয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠা চরেই। তিনি বলেন, এখানে আশা যেমন আছে, নিরাশাও আছে। তাঁর ভাষ্য, বর্ষার পর চর যেমন জেগে ওঠে, তেমনি এক রাতেই নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তবু নদী ভাঙে, চর জাগে, জীবন থেমে থাকে না। দশ বছর আগে চর ছেড়ে সমতলে বাড়ি করেছিলেন তিনি। কিন্তু এক মাসের বেশি থাকতে পারেননি। সমতলে শান্তি পাননি। এখনো দিনভর শ্রম দিয়ে ফসল ফলান তিনি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্রের বুকে পাঁচ বছর আগে জেগে ওঠা পোড়ার চরে এখন প্রায় ৪০০ পরিবার বাস করছে। এই চরের বাসিন্দা আশি বছর বয়সী ফজলু মুন্সী শৈশব থেকে এ পর্যন্ত হিসাব করে জানান, সাতবার তাঁকে চর বদলাতে হয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা, চর জাগে, বসতি গড়ে ওঠে; চর ডোবে, ঠিকানা বদলে যায়। কষ্ট আছে ঠিকই, তবে কৌশল জানলে চরে টিকে থাকা যায়। চরে যাঁর জন্ম, শৈশবেই সে সব শিখে নেয়।
একই চরের মোকছেদ আলী বলেন, পোড়ার চর না জাগলে তাঁদের ছন্নছাড়া হয়ে থাকতে হতো। ষাটোর্ধ্ব এই কৃষকের কথায়, কৃষক যেমন নিশ্চিত করে বলতে পারেন না ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না, তাঁদের থাকাও তেমন। এই বর্ষায় ঘর আছে, পরের বর্ষায় নাও থাকতে পারে। কৃষিকাজই তাঁদের মূল পেশা, আর গরু-ছাগল পালন বাড়তি আয়ের পথ।
অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত চরাঞ্চলে ঘুরলে শুধু ফসলের সবুজ খেত চোখে পড়ে। এসব ফসল এখন যায় সারা দেশে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার চর বেগমগঞ্জে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। অনেক ঘরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও আছে। সেখানে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, ডেইরি ফার্ম ও ছোট ছোট চালকল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী সরফরাজ বান্দা জানান, কুড়িগ্রাম থেকে পাবনার ঢালারচর পর্যন্ত আট শতাধিক স্থানে চর জেগে উঠেছে। তাঁর ভাষ্য, সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ চরে বসবাস করছেন। তাঁদের অধিকাংশই নদীভাঙনে গৃহহীন পরিবার।
এই পরিসংখ্যান নিয়ে অবশ্য দ্বিমতও আছে। কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবুর মতে, চর জরিপ বিচ্ছিন্নভাবে হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান, ভূমি অফিসের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। চরের সমস্যা চিহ্নিত করা ও সমাধানের জন্য তিনি আলাদা চর মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এটি হলে চরাঞ্চলের উন্নয়ন আরও গতি পাবে। কারণ, চরে না গেলে সেখানকার উন্নতির প্রকৃত চিত্র অনুমান করা যায় না।
শফিকুল ইসলাম বলেন, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলার চরাঞ্চলে উন্নয়নের চিত্র এখন স্পষ্ট। একসময় চরের বালুমাটিতে চাষাবাদ করা এবং ফসল বাজারে আনা প্রায় অসম্ভব ছিল। যাতায়াত বলতে ছিল শুধু নৌকা। কুড়িগ্রামের চিলমারী, উলিপুর, রাজিবপুর ও রৌমারীর বিচ্ছিন্ন চরের বাসিন্দারা ঘোড়ার গাড়ি ও গরুর গাড়ি ব্যবহার করে নিজেদের চেষ্টায় পরিস্থিতি বদলেছেন। এখন সেখানে মোটরচালিত ভ্যানও চলছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চরে এখন মরিচ, বাদাম, কাউন, তিল, গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন ও মিষ্টি আলুর মতো ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষির পাশাপাশি পশুপালনেও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উন্নত জাতের ঘাস চাষ করে গড়ে উঠছে ছোট ছোট দুগ্ধখামার। চরের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উপজেলা পর্যায়ের বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। নারীরাও বাঁশ-বেতের পণ্য, দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে পরিবারের আয়ে অবদান রাখছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর কার্যালয়ের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অমূল্য রায় নিয়মিত নদীশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ অঞ্চলের কৃষি নদীনির্ভর। নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হয়। তিনি জানান, চরাঞ্চলে আট থেকে ১০ ফুটের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পাওয়া যায়। সমতলে সেই স্তর ৩৫ থেকে ১০০ ফুটের মধ্যে মেলে। ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও’ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হক্কানীও নদী রক্ষার তাগিদ দিয়েছেন।
নদীভিত্তিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদী বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন চর জেগে ওঠায় নদীপাড়ের মানুষ ও গৃহহীনেরা নতুন আশা পাচ্ছেন। আশ্রয়ের পাশাপাশি জীবিকার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। চরে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও গবাদিপশু কেনাবেচার জন্য নদীতীরে গড়ে উঠেছে অনেক হাটবাজার। এতে চরের অর্থনীতি এগোচ্ছে। তবে তাঁর সতর্কবার্তা, নদীকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে, কারণ নদী বাঁচলেই কৃষি বাঁচবে। চরবাসীর জীবন-জীবিকার উন্নয়নের পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও গতিপথ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নদী বাঁচলে কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নদীকেন্দ্রিক জীবন-সংস্কৃতিও সুরক্ষিত থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে চরের এই চিত্র একসঙ্গে দুটি বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচর ভাঙনকবলিত মানুষের জন্য আশ্রয়, কৃষি ও জীবিকার নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে নদী শুকিয়ে যাওয়া, নিয়মিত ড্রেজিংয়ের অভাব ও প্রবাহে বাধাই চর জেগে ওঠার অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অর্থাৎ চরের উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনি নদী রক্ষাও সমান জরুরি। চরের বাসিন্দাদের সংখ্যা ও জমির পরিমাণ নিয়ে সরকারি ও স্থানীয় তথ্যে অমিল থাকায় পরিকল্পনা ও সেবা পৌঁছানোর কাজও কঠিন হচ্ছে। এখন নজর থাকবে চরের জন্য সমন্বিত জরিপ, নিয়মিত নদীশাসন ও ড্রেজিং এবং চরবাসীর জন্য বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগসেবা বাড়াতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়, তার দিকে।

