স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এই ধান চাষ করে কৃষক এখন বছরে বাড়তি একটি ফসল ফলাতে পারছেন। বেড়েছে উৎপাদন, বেড়েছে আয়ও। অথচ এই অঞ্চলেই একসময় নির্দিষ্ট সময় পরপর দেখা দিত খাদ্যসংকট। আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’। উত্তরাঞ্চলের এই সাফল্য দিবসটির মূল চেতনার সঙ্গে মিলে যায়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এসব জাত মৌসুমি মঙ্গা দূর করতে সহায়ক হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলা এই খাদ্যসংকট দীর্ঘদিন ধরে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে, বিশেষ করে রংপুর বিভাগকে ভুগিয়েছে। এই সাফল্য দেখাচ্ছে, কৃষিতে উদ্ভাবন কীভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে।

কৃষি কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত জাতের ধান পাকতে ১৩৬ থেকে ১৫৫ দিন লাগে। এসব জাতের হেক্টরপ্রতি ফলন ৪ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৫ টন। স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান পাকে ১০০ থেকে ১২০ দিনে। এর হেক্টরপ্রতি ফলন ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ দশমিক ৬ টন। ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান খন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা জানান, প্রচলিত জাতের তুলনায় আগাম জাত ৩০ থেকে ৪০ দিন আগে পাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দা সিফাত জাহান বলেন, যেসব কৃষক আগে বছরে দুটি ফসল তুলতেন, তাঁরা এখন তিনটি পাচ্ছেন। আগাম আমন কাটার পর অনেক কৃষক রবিশস্য বা শীতকালীন ফসল চাষ করছেন। ইফতেখারুদ্দৌলার ভাষ্য, আমন, আলু, সরিষা, শীতকালীন সবজি ও বোরো ধানের সমন্বয়ে পর্যায়ক্রমে চাষ করে কৃষক এখন একই জমিতে বছরে তিনটি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চারটি ফসলও ফলাতে পারছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেশের বার্ষিক ধান উৎপাদনের ৪০ শতাংশ আসে আমন থেকে। চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি জাতের চাষ হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪২২ হেক্টরে, যা মোট জমির প্রায় ২৫ শতাংশ। পাঁচ বছর আগে এই হার ছিল ২০ শতাংশ। বিবিএসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ বাড়ায় গত আমন মৌসুমে সারা দেশে রেকর্ড ১ কোটি ৭৩ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে।
কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া গ্রামের কৃষক আহাদ আলীর কথায় পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। ৫০ বছর বয়সী এই কৃষক এ বছর নয় বিঘা জমির মধ্যে তিন বিঘায় আগাম জাত ও বাকি জমিতে দীর্ঘমেয়াদি জাতের ধান চাষ করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে ওই তিন বিঘার ধান কেটেই সেখানে ফুলকপি, টমেটো ও মরিচের জন্য জমি প্রস্তুত করেছেন। তিনি বলেন, এখন প্রায় এক মাস আগেই আমন কাটা যায়। একই জমিতে বাড়তি একটি ফসল পাওয়ায় আয়ও বাড়ছে।
লালমনিরহাটের কর্ণাপুর গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী রঞ্জিত দেবনাথ আট বছর ধরে আগাম আমন চাষ করছেন। সম্প্রতি আট বিঘার মধ্যে দুই বিঘার ধান কেটেছেন। সেখানে এবার ফুলকপি চাষ করবেন। গত বছর দুই বিঘায় ফুলকপি করে তাঁর ৯০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। আবহাওয়া ঠিক থাকলে এবার লাভ এক লাখ টাকার বেশি হবে বলে তিনি আশা করছেন।
এই উদ্যোগের শুরুটা ২০০৫ সালে। মঙ্গা দূর করতে ব্রি ও বেসরকারি সংস্থা রংপুর-দিনাজপুর রুরাল সার্ভিস স্বল্পমেয়াদি আমনের একটি জাতের মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করে। ব্রির সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও অ্যাগ্রোনমি বিভাগের প্রধান মো. আব্দুল মজিদ এর নেতৃত্ব দেন। তিনি কৃষকের জমিতে ব্রি ধান-৩৩-এর পরীক্ষামূলক চাষ করেন। পরের বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রি ও কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে এর সম্প্রসারণে কাজ করে। ২০১০ সালের মধ্যে পুরো অঞ্চলে ব্যাপকভাবে এই ধানের চাষ শুরু হয়।
আব্দুল মজিদ অতীতের কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, ২০০২ সালে রংপুরে থাকাকালে তিনি দেখেছেন, কৃষকেরা ব্রি-১১-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি ধান চাষ করতেন। সেগুলো কাটা হতো অগ্রহায়ণে, অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। কার্তিকে কৃষিশ্রমিকদের কোনো কাজ থাকত না। তাঁরা আগাম শ্রম বিক্রি করতেন, মহাজনের কাছ থেকে ধান ধার নিতেন। প্রতি মণের বিপরীতে ফেরত দিতে হতো দেড় মণ। অনেককে গবাদিপশুও বিক্রি করে দিতে হতো।
ব্রি ধান-৩৩ চাষের ফলে পরিস্থিতি বদলেছে। এক মাস আগে ধান পাকায় ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। জমি আগে খালি হওয়ায় আলু চাষের সুযোগও মেলে। আব্দুল মজিদের হিসাবে, মৌসুমে আলুর দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা থাকলেও আগাম আলু ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা যেত।
কুড়িগ্রামে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ মো. রওশন কবির বলেন, আগে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের আগে কৃষক প্রায় তিন মাস জমি খালি ফেলে রাখতেন। এখন ওই সময়ে আগাম আমন চাষ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি আমনের ফলন বিঘাপ্রতি ১৩-১৪ মণ থেকে বেড়ে ১৬-১৮ মণে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর বিস্তীর্ণ এলাকায় এসব জাত চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জসহ আরও অনেক জেলায় এর চাষ হচ্ছে।
তবে সব এলাকায় এই জাত উপযোগী নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, জমির অবস্থা ও ফসলের ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্ন। যেসব এলাকায় রোপণের মৌসুমে পানির স্তর উঁচু থাকে, সেখানে এসব জাত চাষ করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞেরা এই জাতের আরও সম্ভাবনার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ওয়াইস কবির বলেন, আকস্মিক বন্যা ও মাটির লবণাক্ততা বাড়ার কারণে কৃষকের ক্ষতি কমাতে স্বল্পমেয়াদি জাত সহায়ক হতে পারে। তিনি মাটির ধরন ও আবহাওয়া বিবেচনা করে রোপণের সময় সমন্বয় এবং উপযুক্ত জাত বেছে নেওয়ার ওপর জোর দেন।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ কার্যালয়ের শস্যব্যবস্থাপনাবিষয়ক কৃষিবিজ্ঞানী শরীফ আহমেদ বলেন, দুই ধান চাষের মাঝের পতিত সময়ে তৃতীয় একটি ফসল চাষ করা গেলে উৎপাদনে বৈচিত্র্য আসবে। এতে আমদানিনির্ভরতাও কমতে পারে। তাঁর মতে, কয়েকটি এলাকার কৃষক ইতিমধ্যে ওই সময়ে সরিষা, মুগ ও মসুরের মতো ফসল চাষ শুরু করেছেন। ডালজাতীয় ফসল মাটির উর্বরতা বাড়ায়। সরিষার পচা পাতা ও অবশিষ্টাংশ মাটিতে জৈব কার্বন যোগ করে। এতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতাও কমতে পারে।
সব মিলিয়ে আগাম আমনের গল্প দেখাচ্ছে, একটি উদ্ভাবন কীভাবে একটি অঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তা ও আয়ের চিত্র বদলে দিতে পারে। আগে যে সময়ে কৃষিশ্রমিকেরা কাজ ও খাবারের অভাবে মহাজনের ঋণে জড়াতেন, এখন সেই সময়েই ধান কাটা, মাড়াই ও শীতকালীন সবজির কাজ চলছে। তবে স্বল্পমেয়াদি জাত এখনো রংপুর বিভাগের মোট আমন জমির মাত্র ২৫ শতাংশে চাষ হচ্ছে, অর্থাৎ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ বাকি আছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধ এলাকায় এই জাত উপযোগী না হওয়ায় সব জায়গায় একই সাফল্য আশা করা যাবে না। এখন নজর থাকবে ডাল ও তেলবীজ চাষ এই পতিত সময়ে কতটা ছড়ায় এবং আগাম জাতের আবাদ নতুন কোন অঞ্চলে সম্প্রসারিত হয়, তার দিকে।

