নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে কাছ থেকে তাঁকে গুলি করা হয়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে স্ত্রীকে তিনি বলেছিলেন, সন্তানদের খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে, একটি সংবাদ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ফিরতে দেরি হবে। সেটিই হয়ে গেল তাঁর শেষ কথা। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহত লুৎফুজ্জামানের বয়স ছিল ৪৪ বছর। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ চালাতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন। তাঁর বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। বাবা মহব্বত আলী ফকির। তিনি থাকতেন তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে।

স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ঘটনার ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। রাত পৌনে আটটার দিকে দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ানকে স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার কোলে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হন লুৎফুজ্জামান। রাত আটটার দিকে তিনি তেলনজিয়ার একটি চায়ের দোকানে চা খান। এরপর বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু মুঠোফোন দোকানে ফেলে আসার বিষয়টি বুঝতে পেরে মিনিট তিনেকের মধ্যে ফিরে আসেন।
ফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক দোকানে এসে দোকানদারের কাছে সিগারেট চান। এরপরই লুৎফুজ্জামানকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়েন তাঁরা। স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে দুজনই দৌড়ে পালিয়ে যান। গুরুতর আহত লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
দোকানি রবিন রাংসা জানান, তিনি তখন চায়ের কাপ ধুচ্ছিলেন। তিনি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছেন এবং ভয়ে বাসায় গিয়ে ঢুকে পড়েন। তাঁর ভাষ্য, দুই যুবকের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হবে। একজনের পরনে ছিল লুঙ্গি, অন্যজনের থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। গুলি করা হয়েছে কাছ থেকে।
লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি নিরালা রেমা ও রুলি রেমা জানান, তাঁরা তখন ঘরের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে দেখেন, তাঁর নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছিল। দোকান থেকে তাঁর শ্বশুরবাড়ি প্রায় ২০ গজ দূরে। তেলনজিয়া গ্রামে অধিকাংশই গারো সম্প্রদায়ের মানুষ।
স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা স্বামীর মরদেহের পাশে ছেলেকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, একজন মানুষকে এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যে গুলি করে মেরে ফেলা হবে, তা তিনি কখনো ভাবেননি। সন্তানদের ভাত খাওয়ানোর সময় গুলির শব্দ শুনে প্রথমে ভেবেছিলেন কেউ পটকা ফোটাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর মানুষের কথায় জানতে পারেন, তাঁর স্বামীকে মেরে ফেলা হয়েছে।
আনন্দিতা বলেন, স্বামীকে তিনি আর ফিরে পাবেন না। তবে যারা তাঁকে হত্যা করেছে এবং দুটি অবুঝ শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়ার শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতাকে বিয়ে করেছিলেন লুৎফুজ্জামান। তাঁদের দুই সন্তান। চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি এবং দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এসআরবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সেখানে যান।
পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের আগেও লুৎফুজ্জামানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে জখম করে। তখন সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রথমত, এক বছরেরও কম সময় আগে একই ব্যক্তির ওপর প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল। সেই ঘটনার তদন্ত কতদূর এগিয়েছিল এবং তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। দ্বিতীয়ত, দুই হামলার মধ্যে সম্পর্ক আছে কি না, আর তাঁর সংবাদ ও ফেসবুক পেজের কাজের সঙ্গে হত্যার যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশ কেবল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ধারণা দিয়েছে, কারণ বা জড়িতদের পরিচয় জানায়নি। তৃতীয়ত, কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যাওয়া এই ঘটনা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন নজর থাকবে সিসিটিভি ফুটেজ ও চেকপোস্টের মাধ্যমে পুলিশ কত দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারে এবং হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তার দিকে।

