রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) আবারও পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন সংশোধনীতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের একটি উন্মুক্ত এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণে আর কোনো বাধা রাখা হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা কিংবা রাজউকের কারিগরি প্রক্রিয়া ছাড়াই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি রাজউকের চেয়ারম্যানও বলছেন, সংশোধনীর বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-২-এর উপসচিব মোছা. লুৎফর নাহার নাজীমের সই করা ১৪ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে ড্যাপের তিনটি সংশোধনী আনার কথা বলা হয়েছে। প্রথম সংশোধনীতে রাজধানীর আইলবহর মৌজার মহানগর জরিপের ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর দাগের জমিকে ভারী শিল্প এলাকা হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব দাগ আগে ড্যাপে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত ছিল। জায়গাটি বুড়িগঙ্গার তীরে হওয়ায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ছাড়পত্র নেওয়ার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনাপত্তি বা মতামত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সিটি জরিপে হালট শ্রেণি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত তা সংরক্ষণের নির্দেশ রয়েছে। নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রে বিধি ও কোড মেনে রাজউকের অনুমোদন নিতে হবে।
দ্বিতীয় সংশোধনীতে ঝিলমিল ও পূর্বাচল প্রকল্প এলাকার জন্য একটি প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ কাঠা বা তার বেশি আয়তনের প্লটে নির্মাণ অনুমোদন নিলে শূন্য দশমিক পাঁচ ফ্লোর এরিয়া রেশিওর (এফএআর) সুবিধা মিলবে। তৃতীয় সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণে কোনো বাধা নেই।
নগর পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, উন্মুক্ত স্থান সংকুচিত হওয়া, বন্যাপ্রবাহ এলাকার সুরক্ষা দুর্বল হওয়া এবং নদীতীরে ভারী শিল্পের সুযোগ তৈরি হওয়া—এই তিনটি সিদ্ধান্ত একসঙ্গে ঢাকার পরিবেশগত সংকটকে আরও জটিল করতে পারে। তাঁদের মতে, বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার তীরে ভারী শিল্পের অনুমোদন পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কারণ শিল্পকারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি নদীতে পড়ার ফলে এর প্রতিবেশ এমনিতেই মারাত্মকভাবে দূষিত।
আইনি প্রশ্নও উঠেছে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর অধীনে বুড়িগঙ্গাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। এ ধরনের এলাকায় পরিবেশদূষণকারী শিল্প স্থাপন, নদী ও জলাশয়ে পয়োবর্জ্য বা তরল বর্জ্য ফেলা এবং কঠিন বর্জ্য অপসারণসহ বিভিন্ন কাজ নিষিদ্ধ। ফলে নদীর তীরে ভারী শিল্পের অনুমোদন এসব বিধিনিষেধের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। ড্যাপে ভারী শিল্পের সংজ্ঞাতেই বলা আছে, এ ধরনের শিল্প থেকে শব্দদূষণ, কম্পন ও প্রচুর ধোঁয়া সৃষ্টি হতে পারে, যা আশপাশের মানুষের বসবাসে অসুবিধা তৈরি করে। লোকালয়ের কাছে ভারী শিল্প স্থাপনে পরিবেশদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি এড়ানোর বিষয়েও পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত আবু মুছা মো. আবদুল্লাহ বন্যাপ্রবাহ এলাকা নিয়ে সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন। তিনি জানান, ড্যাপে কিছু এলাকাকে একই সঙ্গে আবাসিক ভূমি ব্যবহার এবং জলস্রোত ওভারলে জোন বা বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ ধরনের বিরোধপূর্ণ এলাকায় বন্যাপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংরক্ষণের সুপারিশ ছিল। নতুন সংশোধনীতে নেওয়া হয়েছে তার উল্টো সিদ্ধান্ত। তাঁর আশঙ্কা, বন্যাপ্রবাহ এলাকায় নির্মাণের অনুমোদন দিলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধা পাবে। এতে জলাবদ্ধতা বাড়বে, আশপাশে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং ঢাকার বিদ্যমান জলাবদ্ধতা ও হিট আইল্যান্ডের সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। তিনি মনে করেন, এ ধরনের বিধিনিষেধ বদলানোর আগে পর্যাপ্ত হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোলিক সমীক্ষা, বন্যার ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করা জরুরি ছিল। না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দায় নগরবাসীকেই নিতে হবে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ জুরাইন-শ্যামপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এলাকা নিয়ে। পরিকল্পনাবিদদের মতে, সেখানে উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। অথচ সেই জায়গায় ভারী শিল্পের সুযোগ তৈরি হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়বে। জুরাইনের বাসিন্দা ফারজানা তাসনিম বর্ষা বলেন, এলাকায় কোনো মাঠ, পার্ক বা হাঁটার ফুটপাত নেই। সারা বছর মানুষ জলাবদ্ধতা ও বায়ুদূষণে ভোগে, ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত হয়। তাঁর মতে, উন্মুক্ত স্থানে ভারী শিল্পের অনুমোদন প্রমাণ করে, এই অঞ্চলের মানুষের সুস্থভাবে বাঁচার অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তিনি এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, উন্মুক্ত স্থানকে কেবল অব্যবহৃত জমি ভাবার সুযোগ নেই। ঘনবসতির শহরে এসব জায়গা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখে এবং নাগরিকদের বিনোদন ও অবসরের সুযোগ দেয়। জুরাইন-শ্যামপুরের মতো এলাকায় এসব জায়গা কমে গেলে বিকল্প খোলা জায়গা তৈরি করা আরও কঠিন হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, একদিকে ঢাকা জলাবদ্ধতায় ডুবছে, অন্যদিকে বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। আবার বুড়িগঙ্গার তীরে ভারী শিল্পেরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সংশোধিত ড্যাপে বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্রের শর্ত থাকলেও এসব শর্তের আড়ালে কীভাবে ফাঁকি দেওয়া হয়, সেই অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দূষণের কারণে যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছে না, সেখানে ভারী শিল্পের ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া জনস্বাস্থ্যকে হুমকিতে ফেলা এবং জনদুর্ভোগ বাড়ানো ছাড়া কিছু নয়।
প্রক্রিয়া নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকার দেড় বছরে দুবার, অন্তর্বর্তী সরকার একবার এবং বর্তমান সরকার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই নিয়মনীতি না মেনে ড্যাপ বদলেছে। প্রতিবারই জনস্বার্থের চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, আগে অন্তত অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা হতো, এবার সংশ্লিষ্ট কেউই জানে না যে ড্যাপ বদলে গেছে। তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষার ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের কাছ থেকে এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ছিল না। এভাবে চললে পরিকল্পনা প্রহসনে পরিণত হবে এবং জনগণের অর্থ অপচয় হবে।
ড্যাপের ইতিহাসেও বারবার পরিবর্তনের নজির আছে। ২০২২-২৩ সালে প্রণীত এই পরিকল্পনায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় জনঘনত্ব কমিয়ে নাগরিক সেবা বাড়ানো, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষা এবং বন্যাপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ অক্ষুণ্ন রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আবাসন ব্যবসায়ী ও জমির মালিকদের আপত্তির মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভবনের উচ্চতা ও জনঘনত্বসংক্রান্ত বিধান বদলানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও পরিকল্পনায় সংশোধনী আসে। সেই সময় বন্যাপ্রবাহ এলাকাসহ কয়েকটি বিষয়ের সংজ্ঞাও পরিবর্তন করা হয়েছিল। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সর্বশেষ সংশোধনীগুলো আগের সব পরিবর্তনকে ছাড়িয়ে গেছে।
এ ঘটনায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ড্যাপের সর্বশেষ সংশোধনী সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তাঁর ভাষ্য, রাজউকের মতামত ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সরাসরি ড্যাপের বিধি পরিবর্তন করার কথা নয়। তিনি জানান, ড্যাপের কোনো বিধি যুক্ত বা বাদ দিতে রাজউকের একটি কারিগরি কমিটি আছে। কমিটি প্রস্তাবিত সংশোধনী সুপারিশ করে, সেই সুপারিশ কর্তৃপক্ষের সভায় ওঠে, এরপর বোর্ডে আলোচনা হয় এবং প্রয়োজনে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়। এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মন্ত্রণালয় কীভাবে বিধি বদলাল, তা তাঁর জানা নেই।
নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বাসযোগ্যতা সংকট মোকাবিলায় ড্যাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কার্যকর রাখা জরুরি। কিন্তু বারবার পরিবর্তন এলে এবং সেসব পরিবর্তনে জনস্বার্থ, পরিবেশগত প্রভাব ও কারিগরি মূল্যায়ন যথাযথভাবে বিবেচনা না করা হলে পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। তাঁদের মতে, বুড়িগঙ্গার তীরে ভারী শিল্পের অনুমোদন ও বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসনের বাধা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই শুধু ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন নয়। এটি রাজধানীর পরিবেশ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

