আন্তর্জাতিক নৌপথে অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশে ইউরিয়া সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফার্টিগ্লোব। নিজেদের জাহাজ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে বাংলাদেশে সার পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি সৌদি আরব থেকেও ইউরিয়া আমদানির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) সূত্রে জানা গেছে, আমিরাতের একটি জাহাজ ইতিমধ্যে বাগেরহাটের মোংলা বন্দরে ৪৪ হাজার টন ইউরিয়া খালাস করেছে। অন্য একটি জাহাজে করে আরও ৪৫ হাজার ৯০০ টন ইউরিয়া আনা হচ্ছে। জাহাজটি আগামী ২৪ অক্টোবর মোংলা বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের একটি সূত্র জানিয়েছে, আমিরাতের সঙ্গে চুক্তির আওতায় এ পর্যন্ত দুটি জাহাজে দুই চালান ইউরিয়া বাংলাদেশে এসেছে। চলতি অক্টোবর মাসেই আরও দুটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে সার সরবরাহ করা সম্ভব হলে পরবর্তী চালানগুলোও একই পদ্ধতিতে আনা হবে। এতে তুলনামূলকভাবে পরিবহন ব্যয় কিছুটা বেশি হলেও জাতীয় স্বার্থে এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
চলতি ২০২৬ সালের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে বাংলাদেশের মোট ৩ লাখ ৬০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টন নিশ্চিতভাবে কেনার কথা রয়েছে। বাকি ২ লাখ টন ঐচ্ছিক চুক্তির আওতায় রাখা হয়েছে, যা দুর্যোগ বা সংকটের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী কেনা যাবে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এ নৌপথে চলাচলে কড়াকড়ি বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমও বাধার মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজস্ব জাহাজে ইউরিয়া পরিবহন করে সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে ফার্টিগ্লোব।
বাংলাদেশের ইউরিয়া আমদানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস সৌদি আরব। চলতি অর্থবছরে দেশটির সঙ্গে সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে ৫ লাখ ২০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার টন নিশ্চিতভাবে কেনার এবং বাকি ২ লাখ টন ঐচ্ছিকভাবে কেনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্যাবিক এগ্রো নিউট্রিয়েন্টস ইউরিয়া পরিবহনের জন্য একাধিকবার বন্দর পরিবর্তন করেছে। আগে আল-জুবাইল বন্দর থেকে সার পাঠানো হতো। পরে হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি বিবেচনায় সরবরাহের কেন্দ্র ইয়ানবু বন্দরে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে নিওম বন্দর ব্যবহার করে ইউরিয়া আমদানির কার্যক্রম চলছে। এ পথে লোহিত সাগর হয়ে বাংলাদেশে সার পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, বর্তমানে ইউরিয়া সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের সংকট দেখা যাচ্ছে না। আমিরাতের ফার্টিগ্লোব হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে সার পৌঁছে দিচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সরবরাহকারীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি জানান, চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া নিয়ে দুটি জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আরও দুটি জাহাজে সার বোঝাইয়ের কাজ চলছে। সেপ্টেম্বর মাসেও দুটি জাহাজে ইউরিয়া দেশে এসেছে।
বিসিআইসির এই কর্মকর্তা মনে করেন, হুথিদের হামলার কারণে সার আমদানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে—এমন আশঙ্কা আপাতত নেই। সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ভিত্তিতে আমদানির পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচলের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিকল্প বন্দর এবং নিজস্ব জাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে ইউরিয়া সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।

