বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশ নির্মাণের এক বছরের মধ্যেই ভেঙে ধসে পড়েছে। প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় সংস্কার শেষ না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এতে তিন্দু, নাফাখুম ও অমিয়াখুমে যেতে আগ্রহী পর্যটকদের যাতায়াত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যটননির্ভর স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও যোগাযোগ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সালের সই করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, থানচি-আলীকদম সড়কের ২১ কিলোমিটার পয়েন্ট থেকে তিন্দু বাজার পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি পুনরায় সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী না করা পর্যন্ত পর্যটকবাহী যান চলবে না।
সড়কটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিশেষভাবে সামনে আসে গত ৫ অক্টোবরের একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর। ওই দিন বিকেলে আলীকদম-থানচি সংযোগ সড়কের ২১ কিলোমিটার এলাকায় একটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন, আহত হন আরও পাঁচজন। বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটিতে পর্যটক ও স্থানীয় যাত্রী ছিলেন। আলীকদম উপজেলা সদর থেকে তিন্দু বাজার, নাফাখুম ও অমিয়াখুমের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর পাহাড়ি ঢালু পথে নামার সময় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারায়।
দুর্গম পাহাড়ি পথে এই দুর্ঘটনা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা থাকায় এবং সংস্কারকাজ চলমান থাকায় ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সেই কারণেই পর্যটকবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইউএনও বলেন, তিন্দু বাজারের সংযোগ সড়কটি এখনো পুরোপুরি মেরামত করা হয়নি। সংস্কারকাজ চলছে। সড়কের নানা অংশ ভাঙাচোরা থাকায় পর্যটকেরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এ কারণেই সংস্কার শেষ না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এক বছর আগে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। নির্মাণকাজে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ছিল মেসার্স ইউটিমং। সেই প্রতিষ্ঠানের সাবঠিকাদার হিসেবে আনিসুর রহমান সুজন কাজটি সম্পন্ন করেন বলে তাঁরা জানান।
তবে নির্মাণের সময়ই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিলেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, বিষয়টি এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি। সেই সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল। এখন এক বছরের ব্যবধানে সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও ধস দেখা দিয়েছে, ফলে যান চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পাড়াপ্রধানেরা মনে করেন, নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা হলে সড়কের বর্তমান দশা এবং এর পেছনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে। অবশ্য এ বিষয়ে এলজিইডি বা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো এখনো যাচাইসাপেক্ষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক বান্দরবানের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যান। তাঁদের যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক যোগাযোগও সচল রাখা প্রয়োজন।
নিষেধাজ্ঞার পেছনে প্রশাসনের আরেকটি সমস্যাও উঠে এসেছে। ইউএনও জানান, পর্যটকেরা আলীকদম হয়ে থানচির তিন্দু এলাকায় আসেন বলে তাঁদের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে আগাম কোনো তথ্য থাকে না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগী পর্যটকদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং ঘটনার সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে প্রশাসনকে সমস্যায় পড়তে হয়।
পাহাড়ি জনপদের সড়ক নির্মাণে মান নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, এই ঘটনা তা আবারও সামনে এনেছে। ১৭ কোটি টাকার একটি সড়ক এক বছরেই ভেঙে পড়লে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, নির্মাণকাজের তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এখন দেখার বিষয়, সংস্কারকাজ কত দ্রুত শেষ হয় এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের আওতায় আসে কি না। সংস্কার শেষ হয়ে যান চলাচল কবে আবার চালু হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।

